ভারতের উত্থানের গল্প
আগামী ১৩ বছরের মধ্যেই ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির আসনে বসতে চলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সমীক্ষা সংস্থা ‘ইওয়াই ইকোনমিক ওয়াচ’-এর একটি রিপোর্ট ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে ইতিমধ্যেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতের দ্রুত আর্থিক বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কার আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশটিকে অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করবে।
বর্তমানে ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতির আকার দাঁড়াতে পারে ২০.৭ ট্রিলিয়ন ডলার, আর ২০৩৮ সালের মধ্যে তা বেড়ে হতে পারে প্রায় ৩৪.২ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অগ্রগতির পিছনে মূল চালিকা শক্তি হলো দেশের বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ প্রবণতা। ভারতের জনগণের গড় বয়স এখন ২৮.৮ বছর, যা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি ঋণ ও জিডিপির অনুপাতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালে এই অনুপাত ছিল ৮১.৩ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৫.৮ শতাংশে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই স্থিতিশীলতা ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাড়তি গতি এনে দেবে।
‘ইওয়াই ইকোনমিক ওয়াচ’-এর মুখ্য নীতি উপদেষ্টা ডিকে শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, ‘‘বিশ্ব অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ভারত দক্ষ কর্মশক্তি, শক্তিশালী সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নতির ধারায় এগিয়ে চলেছে।’’ তাঁর মতে, ২০৪৭ সালের মধ্যেই ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব।
চীনের তুলনায় ভারত বড় সুবিধা পাচ্ছে কম বয়সী জনসংখ্যার কারণে। বর্তমানে চীনের ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ধীর করছে। অন্যদিকে, ভারতের জিএসটি, ইউপিআই এবং প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ (পিএলআই)-এর মতো পদক্ষেপ শিল্প ও ব্যবসায়িক উন্নয়নের জন্য বড় ভূমিকা রাখছে। ২০২৮ সালের মধ্যে বিনিয়োগের দিক থেকেও ভারত বিশ্বের তৃতীয় স্থানে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর প্রভাব ভারতের জিডিপির মাত্র ০.৯ শতাংশ হতে পারে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি সামান্যই প্রভাবিত হবে। ভারত ইতিমধ্যেই বিকল্প বাজারের দিকে নজর দিয়েছে এবং দেশীয় বাজারের শক্তিশালী চাহিদা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখবে।
মার্কিন শুল্কনীতির প্রেক্ষিতে ভারত কানাডা, ব্রাজিল ও আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি, রাশিয়ার কাছ থেকেও তেলের দামে ছাড় পাচ্ছে ভারত। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিত মিলছে।
আগামী দিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) বৈঠকে ভারত, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই বৈঠক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে, যা ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতি আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সব মিলিয়ে, ভারতের সামনে আগামী এক দশক এক সুবর্ণ সুযোগের সময়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সংস্কার যদি এই ধারায় চলতে থাকে, তবে ২০৩৮ সালের মধ্যেই ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির মুকুট জিততে পারে।