ভাইফোঁটার আগে গঙ্গায় ইলিশের উৎসব
উৎসবের মৌসুমে বাঙালির প্রিয় মাছ ইলিশে সয়লাব হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের নদীপাড়। ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’র প্রভাবের মধ্যেই গঙ্গায় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ঢুকছে পদ্মার বাঁকা পথ ধরে, আর তাতে খুশি মৎস্যজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ ক্রেতারাও। উৎসবের সময় কালীপুজো ও ভাইফোঁটার আগে বাজারে ইলিশের এই বিপুল উপস্থিতি যেন এক উপহার হয়ে এসেছে। তবে এর পেছনে রয়েছে কিছু বেআইনি কার্যকলাপ, যা মৎস্য দফতরের নজর কাড়ছে।
পদ্মা থেকে গঙ্গায় ইলিশের আগমন
প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ে ইলিশ সমুদ্রের নোনা জল ছেড়ে মিষ্টি জলে ডিম ছাড়তে আসে। এই সময়ই ইলিশ পদ্মা ও গঙ্গায় উঠে আসে। বাংলাদেশে এই সময়ে ইলিশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৎস্যজীবীদের কঠোরভাবে এই নিষেধাজ্ঞা মানতে বাধ্য করা হয়। তবে ভারতীয় অংশে গঙ্গায় ইলিশ ধরায় তেমন কড়াকড়ি নেই। পদ্মার বাঁকা পথ ধরে ফরাক্কা বাঁধের উজানে গঙ্গার জলসীমায় ঢুকছে ইলিশের ঝাঁক। ফরাক্কা, বাসুদেবপুর, নিমতিতা, ধুলিয়ান, হাজারপুর, অর্জুনপুর সহ একাধিক অঞ্চলে নদীর ঘাটগুলো ভোর থেকেই মৎস্যজীবীদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠছে।
মৎস্যজীবীরা নদীতে টিনের ডোঙা নিয়ে জাল ফেলছেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ তাদের জালে আটকা পড়ছে। ছোট ইলিশ থেকে শুরু করে সাতশো-আটশো গ্রাম ওজনের বড় ইলিশও ধরা পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে মৎস্যজীবীদের মুখে হাসি ফুটেছে। ইলিশের এই বিস্তৃত ঝাঁক ধরতে না পারলে তাদের জীবিকার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তো।
পাইকারি বাজারে ইলিশের দাম: সস্তায় মিলছে উৎসবের ভেট
ইলিশের এই বিপুল পরিমাণে ধরা পড়া মানেই বাজারে দাম কমে আসা। ফরাক্কা, বাসুদেবপুর এবং শমসেরগঞ্জের পাইকারি বাজারে ইলিশ জলের দামে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা উচ্ছ্বসিত, কারণ এত কম দামে ইলিশের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ সহজে আসে না। একেবারে ছোট ইলিশ, যাদের ওজন মাত্র ৬০-১০০ গ্রাম, মিলছে মাত্র ৫০ টাকা কেজি দরে। আর একটু বড় ইলিশের দামও খুব বেশি নয়, ২০০ টাকা কেজিতে মিলছে। হাজার টাকার মধ্যেও ভালো সাইজের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে, যা সাধারণ বাজারে বিরল।
বাসুদেবপুরের মৎস্যজীবী গৌতম হালদার বললেন, “বছর পাঁচেক পর এত ইলিশ ধরার সুযোগ হয়েছে। বেশির ভাগ ইলিশই ছোট সাইজের, তবে কিছু বড় ইলিশও উঠছে। পাইকারি বাজারে সস্তায় বিক্রি হচ্ছে বলে সাধারণ ক্রেতারা খুব খুশি।”
ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা: আইন ভাঙার অভিযোগ
তবে এই ইলিশ ধরার কার্যক্রম নিয়ে রয়েছে এক বিতর্ক। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ইলিশ ধরা বেআইনি, কারণ এটি ইলিশের প্রজননকাল। এই সময় ইলিশ ডিম পাড়তে আসে এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই এই সময়ে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে এই নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে মানা হয়। সেখানে প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে মৎস্যজীবীদের ইলিশ ধরতে দেওয়া হয় না।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সেই কড়া নিয়ন্ত্রণ ততটা কার্যকরী নয়। মৎস্যজীবীরা নিয়ম না মেনে ইলিশ ধরেই চলেছেন। শমসেরগঞ্জের মৎস্যজীবী প্রসেনজিৎ হালদার বলেন, “আমরা জানি এই সময়ে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, বিশেষ করে ছোট ইলিশ ধরায়। কিন্তু এখানে ইলিশ সহজে পাওয়া যায় না। আমরা যদি এই সুযোগটা ছাড়ি, তাহলে আমাদের পেটে ভাত জুটবে না। তাই যা পাচ্ছি, তাই ধরছি।”
প্রশাসনের নজরদারি ও মৎস্যজীবীদের যুক্তি
মৎস্য দফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইলিশের প্রজননের সময় মৎস্যজীবীদের এইভাবে মাছ ধরা আইনত নিষিদ্ধ। তবে তারা মানছেন যে বাংলাদেশে যেমন কঠোর নজরদারি চলে, তেমনটা এ রাজ্যে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে মৎস্যজীবীদের আয় এবং জীবিকার উপর নির্ভর করে তাদের ইলিশ ধরার কাজ। তাই আইন মানার জন্য তাদের উপর অতিরিক্ত চাপ দিলে, তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, মৎস্যজীবীরাও বলছেন, এই সময়ে ইলিশ ধরার সুযোগ না পেলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়বে। অনেকেই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে জাল ফেলে কোনও লাভ পাননি, কিন্তু এই সময়ে এত ইলিশ ধরার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইছেন না কেউই।
উৎসবের আনন্দ ও বাস্তবতার সংঘাত
কালীপুজো ও ভাইফোঁটার আগে গঙ্গার ইলিশ যেন এক আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তবে এর পেছনে যে বেআইনি কার্যকলাপ রয়েছে, সেটাও প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না। ছোট ইলিশ ধরার কারণে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপটে মৎস্যজীবীরা সেই ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাজারে সস্তায় ইলিশ পাওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা খুবই খুশি। উৎসবের এই সময়ে ইলিশের স্বাদ পাওয়ার আনন্দ তাদের কাছে অতুলনীয়। যদিও ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে যে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেটি না মানার কারণে ভবিষ্যতে ইলিশের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। প্রশাসনও বিষয়টি নজর রাখছে, তবে আপাতত মৎস্যজীবীদের জীবিকা রক্ষাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ কথা
ইলিশের এই বিপুল আগমন বাঙালির উৎসবের আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এর পেছনের বেআইনি কার্যকলাপ এবং মৎস্যজীবীদের জীবিকার চ্যালেঞ্জগুলোও উপেক্ষা করা যায় না।