বীরভূমের রাজনীতিতে একসময় অনুব্রত মণ্ডলকে ঘিরে ছিল একক কর্তৃত্ব। ‘‘কেষ্টদার নির্দেশ ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না’’— এমনটাই ছিল জেলার মানুষের ধারণা। তবে এখন সেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। শনিবার বীরভূমে তৃণমূলের কোর কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, অনুব্রত মণ্ডল বা অন্য কোনও নেতা যদি কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় যান, তবে সেই এলাকার দায়িত্বে থাকা নেতাকে জানিয়েই যেতে হবে।
কোর কমিটিতে আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি
অনুব্রত মণ্ডলকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বীরভূম তৃণমূলের কোর কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এই বৈঠকে মুখোমুখি হন অনুব্রত ও কাজল শেখ। বৈঠকের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোর কমিটির আহ্বায়ক বিকাশ রায়চৌধুরীর ফোনে কথা হয়। মমতার নির্দেশেই অনুব্রতকে কোর কমিটিতে যুক্ত করা হয়।
কোর কমিটিতে অনুব্রত সদস্য হলেও, তিনি সর্বেসর্বা নন। কমিটির নেতৃত্বে থাকছেন বিকাশ রায়চৌধুরী। দলের ভেতরে অনেকে মনে করছেন, এটি কার্যত অনুব্রতের একক কর্তৃত্বে রাশ টানার বার্তা। জেলা সভাপতির পদে থাকলেও, এখন তাঁর চলাফেরা কোর কমিটির নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কাজল-অনুব্রত দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট
অনুব্রত এবং কাজল শেখের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব বীরভূমের রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। অনুব্রতের গ্রেফতারের পরে কাজলের উত্থান তৃণমূলের অন্দরে নতুন সমীকরণ তৈরি করে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে কাজল জেলা পরিষদের সভাধিপতি হন। অনুব্রতের জামিনে মুক্তির পরে এই দুই নেতার সম্পর্ক পুনরায় আলোচনায় আসে। বিজয়া সম্মিলনী সভার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই নেতার দূরত্ব আবার প্রকাশ্যে আসে।
বৈঠকে সমঝোতার বার্তা
শনিবারের বৈঠকে দু’জনের মধ্যে কুশল বিনিময় হয়। কাজল শেখ অনুব্রতের স্বাস্থ্যের খবর নেন। বৈঠক শেষে কাজল জানান, “অনুব্রত মণ্ডল আমার রাজনৈতিক অভিভাবক। আমাদের মধ্যে কোনও বিভেদ নেই।” একইভাবে বিকাশ রায়চৌধুরীও জানান, “অনুব্রত-কাজলের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। সবাই মিলে দলের উন্নতির জন্য কাজ করতে হবে।”
নতুন নিয়ম: এলাকা ভিত্তিক দায়িত্ব
বৈঠকে একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—দলের প্রতিটি নেতাকে এলাকাভিত্তিক দায়িত্বে কাজ করতে হবে। অন্য নেতারা যদি কোনও অঞ্চলে যান, তাহলে দায়িত্বে থাকা নেতাকে জানাতে হবে। এর ফলে গোষ্ঠীকোন্দল কমবে এবং সাংগঠনিক শক্তি বাড়বে বলে দলের একাংশের মত।
অনুব্রতের নতুন ভূমিকা
যদিও অনুব্রত কোর কমিটির সদস্য হিসেবে যুক্ত, তবু তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তিনি কি শুধুই কোর কমিটির সদস্য, নাকি জেলা সভাপতি? এই পরিবর্তন তাঁর ক্ষমতার সীমা কতটা সংকুচিত করে, তা ভবিষ্যৎ বলবে।
বীরভূমে তৃণমূলের এই সিদ্ধান্ত জেলা রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অনুব্রত-কাজল সম্পর্ক আদৌ কতটা মসৃণ হবে, সেটি সময়ের অপেক্ষা।