বেঙ্গালুরুর ইঞ্জিনিয়ার অতুলের মর্মান্তিক মৃত্যু !
বেঙ্গালুরুর প্রযুক্তি নগরে এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেছে। বিহারের সমস্তীপুরের বাসিন্দা অতুল সুভাষ, যিনি একটি নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার পদে কর্মরত ছিলেন, সোমবার তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যান। ঘটনাস্থলে উদ্ধার হওয়া ২৪ পাতার সুইসাইড নোটে বারবার উল্লেখ রয়েছে—“বিচার এখনও বাকি!” এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সারা দেশে শোরগোল পড়ে গেছে।
অতুলের সুইসাইড নোট ও ভিডিয়ো: মর্মস্পর্শী বার্তা
অতুলের সুইসাইড নোটটি চার পাতা হাতে লেখা এবং বাকি ২০ পাতা টাইপ করা। এই নোট তিনি তাঁর পরিচিত এবং একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠান। বাড়িতে কী কী আছে, গাড়ির চাবি কোথায়, সেই তালিকাও তিনি আলমারিতে সেঁটে রেখেছিলেন। পাশাপাশি, তিনি একটি ঘণ্টা দেড়েকের ভিডিয়ো রেকর্ড করেন। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা গেছে, “বিচার না মেলা পর্যন্ত আমার অস্থি বিসর্জন দিও না!”
পারিবারিক কলহ ও বিচ্ছেদের মামলা
২০১৯ সালে নিকিতা সিংহানিয়ার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন অতুল। তাঁদের এক সন্তানও রয়েছে। কিন্তু সম্পর্কের অবনতি ঘটলে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা দায়ের হয়। সেই মামলা চলাকালীন অতুলকে মাসে ৪০ হাজার টাকা খোরপোষ দিতে হত। তাছাড়া, অতুলের স্ত্রী এবং তাঁর পরিবার অতিরিক্ত ২-৪ লক্ষ টাকা দাবি করেছিলেন বলে অভিযোগ। নিকিতা উত্তরপ্রদেশের আদালতে অতুলের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করেন, যার মধ্যে ছিল হত্যা, গার্হস্থ্য হিংসা এবং টাকার জন্য হয়রানির অভিযোগ।
আইনি প্রক্রিয়ার চাপ ও অতুলের অবসাদ
পরিবারের দাবি, অতুলকে প্রায় ৪০ বার বেঙ্গালুরু থেকে উত্তরপ্রদেশে যেতে হয়েছে আদালতের শুনানিতে উপস্থিত থাকার জন্য। সম্প্রতি, পারিবারিক আদালতে এক মামলায় তাঁর বিপক্ষে রায় গেলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরিবারের মতে, আইনি প্রক্রিয়ার অযাচিত চাপ এবং মিথ্যা অভিযোগের শিকার হয়ে তিনি এই চরম সিদ্ধান্ত নেন।
নিকিতা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অতুলের পরিবারের অভিযোগ, নিকিতা এবং তাঁর পরিবারের অত্যাচারই তাঁকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে। অতুলের ভাইয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে বেঙ্গালুরু পুলিশ নিকিতা, তাঁর মা নিশা সিংহানিয়া, এবং তাঁর ভাই অনুরাগ সিংহানিয়াসহ মোট পাঁচ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১০৮ নম্বর ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা হয়েছে।
নিকিতার বক্তব্য ও আইনি প্রতিক্রিয়া
অন্য দিকে, নিকিতার পরিবারের দাবি, অতুলের সুইসাইড নোটের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁরা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে আইনজীবীর দিকে নির্দেশ করেছেন।
আত্মঘাতী হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা
অতুল তাঁর চার বছরের সন্তানের জন্য একটি চিঠি রেখে গেছেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, “তোমার জন্য আমি আমার জীবন দিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু তোমার জানা উচিত, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”
সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
এই ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া তুঙ্গে। নেটাগরিকদের একাংশ পুরুষদের অধিকার রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। অনেকে পারিবারিক আদালতের প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। কেন্দ্রের আইন ও বিচার মন্ত্রক পারিবারিক আদালতের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তবে এই ঘটনার পরেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—আইন কি সত্যিই নিরপেক্ষ? নাকি এক পক্ষেরই স্বার্থ রক্ষা করে?
বিচার ও সমাধানের দাবি
অতুলের মৃত্যুর ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি সমগ্র আইনি এবং সামাজিক প্রক্রিয়ার প্রতি বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। বিচারের দাবি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। অতুলের পরিবারের বক্তব্য—“বিচার না হওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই।”