বছর শেষে মায়ের ঘরে ফেরার আকুতি!
দুর্গাপুজো মানেই শুধু পূজা-পাঠ বা মণ্ডপের আলোকসজ্জা নয়, বরং বছরের শেষের সেই ক্ষণিক, যখন মায়ের ঘরে ফিরে যাওয়ার আকুতি জাগে। শহরের ব্যস্ততা, প্রযুক্তির চাপ বা দূরের জীবন—সবকিছুই পেছনে ফেলে সেই ছোটবেলার স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়াই এই উৎসবের আসল আনন্দ।
শরৎ যখন আসে, আকাশে মেঘের ফাঁকে নীলাভ আলো পড়ে, সন্ধ্যার ভেজা মাটির ঘ্রাণে মিশে আসে শিউলি ফুলের সুবাস, তখন শহরের কোনো মানুষের মনও উদাসীন থাকতে পারে না। রিকশা হাতে ধাপাতে ধাপাতে বা অফিসের ক্লান্ত দুপুর পার করেও মানুষজন হঠাৎ নিজেকে মায়ের ঘরে ফেরার ভাবনায় পায়। আর সেই মায়ের ঘর মানেই পূজার ভোগ, মিষ্টির ঘ্রাণ আর সেই হাতের স্নেহমাখা ছোঁয়া।
পুজোর আড্ডা, মণ্ডপের ভিড়, কোলাহল—সবশেষে যখন ফিরে আসে বাড়ি, তখন চোখে ভেসে ওঠে মা যে হাতে ভোগ সাজাতেন, নিমকি, গজা, গোল গুড়ের নাড়ু ও নারকোলের ছাপা তৈরি করতেন—তিনিই সেই স্পর্শ, সেই অভ্যস্ত হাত। ছোটবেলার সেই মুহূর্তগুলো এখনো স্মৃতির পাতায় যেন রূপোলি হয়ে ভেসে ওঠে।
ছোটবেলার ঘর, যেখানে দুর্গা, গণেশ, কার্তিকের পুজো হত, সেই জায়গায় মায়ের আশ্রয় আর ভালোবাসা ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আজও অনেকের জন্য পুজো মানে সেই অল্প আয়োজনের সান্ধ্যভোগ, যেখানে ধ্যান ও খেলার মধ্যে মিলিত হত আনন্দ আর শান্তি।
বিদেশে থাকা মেয়ের জন্য এই আকুতি আরও তীব্র। কম বয়সে যেসব আনন্দ কেবল মাটির বাঁশবনের রাস্তা, হলুদ রঙের দুই মহলা এবং ছোট্ট উতলা মুখের সাথে মিলিত হত, সেই স্মৃতি আজও বুকের মধ্যে উজ্জ্বল। বিদেশে থাকলেও শরৎ এসে ধানের মাঠে হাওয়ার সঙ্গে মিশে যাওয়া সেই সুবাস, পুরনো গন্ধ তাকে বারবার তাড়িয়ে নিয়ে আসে বাড়ির পথে।
তৃণার মতো বহু মানুষের মধ্যেও এই আকুতি একই—শরতের আভাস, ধূপ, ধূনো, নতুন জামা, নাড়ু, পায়েস—সবই মনে করিয়ে দেয় মায়ের ঘরে ফেরার পথ। হাত দিয়ে ছোঁয়া সম্ভব না হলেও, মনের ভিতরেই সেই স্বস্তি, সেই প্রশ্রয় আর ছোটবেলার গন্ধের মিলন আজও আছে।
পুজোর এই কয়েকদিন, বিজয়ার মিষ্টির ঘ্রাণ, মায়ের চোখের হাসি, আর সেই পরিচিত হাতের স্নেহ—সবই বছরের সব ব্যস্ততা ভুলিয়ে দেয়। মনের গভীরে পাওয়া এই পাওয়া হারানো ঘর-বাড়ি, এই মায়ের উপস্থিতি, তৃণার মতো মানুষেরই আজকের ভালো থাকার আশ্রয়। এই ক্ষণিকই দুর্গাপুজোর আসল মায়া—যেখানে বছরশেষে ফিরে যাওয়ার আনন্দ আর মায়ের হাতে লুকানো সেই গন্ধ এক সঙ্গে মিলিত হয়।