বঙ্গ রাজনীতিতে রং বদলের খেলা!
বাংলার রাজনীতিতে দলবদলের সংস্কৃতি এখন আর বিরল ঘটনা নয়। একসময় যা ছিল অস্বাভাবিক, এখন তা-ই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক নেতা তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান পাল্টে ফেলেছেন, কেউ একাধিকবার দল পরিবর্তন করেছেন, কেউ আবার স্বীকার করেছেন তাঁদের ভুল। এই প্রতিবেদনে রইল পাঁচ জন এমন রাজনীতিকের গল্প, যাঁদের দলবদলের কৌশল নজর কেড়েছে সকলের।
অর্জুন সিংহ: রাজনীতির রঙিন খেলোয়াড়
২০১৯ সালে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন অর্জুন সিংহ। সেই বছরই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী হয়ে তিনি জয় লাভ করেন। তবে ২০২২ সালে তিনি আবার ফিরে যান তৃণমূলে। কিন্তু ২০২৪ সালে, যখন তৃণমূল ৪২টি আসনের প্রার্থী ঘোষণা করছিল, অর্জুন ছিলেন মঞ্চে, কিন্তু ব্যারাকপুরের টিকিট পাননি। হতাশ হয়ে আবারও বিজেপিতে যোগ দেন এবং প্রার্থী হন, তবে এবার আর জয় পাননি। দলবদল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সময়ই সব উত্তর দেবে।” তবে হোলির দিনে তিনি চুটিয়ে রং খেলেছেন।
জয়প্রকাশ মজুমদার: নীতির প্রশ্নে দলবদল?
জয়প্রকাশ মজুমদার একসময় ছিলেন কংগ্রেসে, পরে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালে বিজেপির টিকিটে করিমপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে লড়েন এবং ভোটের দিন তৃণমূলের দুষ্কৃতীদের দ্বারা আক্রান্ত হন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনিই যোগ দেন তৃণমূলে। তিনি বলেন, “যদি নীতির ভিত্তিতে দলবদল হয়, তাহলে তা অন্যায় নয়। তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে দলবদল ঠিক নয়।” হোলির দিন তিনিও রঙের উৎসবে মেতে ছিলেন।
রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়: অভিমানের ভুল থেকে ফেরা
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দিল্লিতে গিয়ে অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করে বিজেপিতে যোগ দেন এবং ডোমজুড় থেকে প্রার্থী হন। কিন্তু ২০১৬ সালের জয়ী রাজীব ২০২১ সালে পরাজিত হন। পরে, দলের প্রতি অভিমান ভুলে তিনি ফের তৃণমূলে ফিরে আসেন। এখন তিনি বলেন, “অভিমানে ভুল করেছিলাম, তবে এখন দলের কাজ করছি এবং ভালো আছি।” তিনিও হোলির আনন্দে সামিল হয়েছিলেন।
রুদ্রনীল ঘোষ: রাজনৈতিক অবস্থান বদলের যুক্তি
একসময় সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই-এর নেতা ছিলেন অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। পরে তৃণমূল ঘনিষ্ঠ হন এবং সরকারে বিভিন্ন দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু পরে বিজেপিতে যোগ দেন এবং সক্রিয়ভাবে দলের প্রচারে অংশ নেন। তিনি বলেন, “রাজনীতিতে মত বদল করা অপরাধ নয়। মানুষ যেমন তাঁদের মত পাল্টান, তেমন রাজনীতিবিদদেরও মত পরিবর্তন করার অধিকার আছে।” হোলির দিনে তিনি সিনেমার এক আড্ডায় সামান্য আবির মেখেছেন।
তাপসী মণ্ডল: দলের স্বার্থে বদল?
২০১৬ সালে সিপিএমের টিকিটে হলদিয়ার বিধায়ক নির্বাচিত হন তাপসী মণ্ডল। ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বিজেপিতে যোগ দেন এবং হলদিয়ার বিধায়ক নির্বাচিত হন। কিন্তু দিন কয়েক আগেই তিনি তৃণমূলে ফিরে আসেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই একটি সরকারি পদও পেয়ে যান। দলবদলের বিষয়ে তিনি বলেন, “রাজনীতিতে দলবদল এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি হলদিয়াবাসীর স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তবে হোলির দিন তিনি অসুস্থ থাকায় রং খেলতে পারেননি, বাড়িতে বসেই শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।
উপসংহার
রাজনীতিতে দলবদলের ঘটনা নতুন নয়, কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে এখন তা নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে। আদর্শের জন্য, নাকি উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য – সেই বিতর্ক থাকবেই। তবে একটাই কথা বলা যায়, এই নেতারা রাজনীতির মঞ্চে যতই দল বদল করুন না কেন, সাধারণ মানুষের চোখে তাঁদের অবস্থান সবসময়ই বিচার্য থাকবে।