আফ্রিকার মতোই কি বড় দেখাবে ভারত?
পৃথিবীর মানচিত্র বদলানোর প্রস্তাব রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় অনুমোদন পেয়েছে। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে বহুল ব্যবহৃত ‘মার্কেটর প্রোজেকশন’-এর পরিবর্তে সামনে এসেছে ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ। নতুন মানচিত্রে ভারতের মতো বিষুবরেখার কাছাকাছি দেশগুলিকে তুলনামূলক ভাবে বড় দেখাবে। উল্টো দিকে ছোট হয়ে যাবে ইউরোপ, আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ডের মতো উত্তর গোলার্ধের বহু অঞ্চল। তবে মানচিত্র বদলালেও ভারতের ভূখণ্ডগত অবস্থান নিয়ে কোনও আপস করতে নারাজ নয়াদিল্লি।
গত ৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। ১৭১টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। আমেরিকা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। ভারত অবশ্য পক্ষে ভোট দিলেও পর দিনই স্পষ্ট করে দেয়, মানচিত্রে দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডের কোনও ভুল বা বিকৃতি মেনে নেওয়া হবে না।
এর নেপথ্যে রয়েছে বহু পুরনো একটি সমস্যা। পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু কাগজের মানচিত্র দ্বিমাত্রিক। ফলে গোল পৃথিবীর পৃষ্ঠকে সমতলে তুলে ধরতে গেলে কোথাও না কোথাও আকৃতি বা আয়তনের বিকৃতি ঘটবেই। ১৫৬৯ সালে জেরার্ডাস মার্কেটরের তৈরি প্রক্ষেপণে মূলত দিক ও কোণের নির্ভুলতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলি প্রকৃত আয়তনের তুলনায় অনেক বড় দেখায়।
সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড। প্রচলিত মানচিত্রে দ্বীপটিকে আফ্রিকার কাছাকাছি আয়তনের মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়। একই ভাবে আফ্রিকা, ভারত-সহ বিষুবরেখার কাছাকাছি বহু দেশ মানচিত্রে প্রকৃত আয়তনের তুলনায় ছোট দেখানো হয়।
এই বিকৃতি কমানোর লক্ষ্যেই ২০১৮ সালে বোয়ান সাভরিচ, টম প্যাটারসন এবং বার্নহার্ড জেনি ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রক্ষেপণ তৈরি করেন। এই পদ্ধতিতে মহাদেশগুলির আপেক্ষিক ক্ষেত্রফল যতটা সম্ভব বাস্তবের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে নতুন মানচিত্রে আফ্রিকা হয়ে উঠবে বিশালাকার একটি মহাদেশ। এমনকি তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, ভারত এবং ইউরোপের বড় অংশকে বসানো সম্ভব হবে।
তবে ‘নতুন মানচিত্র’ মানেই যে দেশগুলির বাস্তব আয়তন বদলে যাচ্ছে, তা নয়। পরিবর্তনটি আসলে মানচিত্রে পৃথিবীকে দেখানোর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ ভারত এক ইঞ্চিও বাড়বে না, আবার আমেরিকাও বাস্তবে ছোট হবে না—শুধু মানচিত্রে তাদের আপেক্ষিক চেহারা বদলে যাবে।
এই জায়গাতেই ভারতের আপত্তি অন্য মাত্রা পেয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সবাল জানান, কোনও নির্দিষ্ট মানচিত্র বা প্রক্ষেপণকে সমর্থন করাই ভারতের অবস্থান নয়। তবে ভারতের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ডই দেখাতে হবে।
বিশেষ করে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ নিয়ে নয়াদিল্লির অবস্থান ‘স্পষ্ট, অপরিবর্তনীয় এবং আপসহীন’ বলে জানানো হয়েছে। কারণ মানচিত্রের ক্ষেত্রে শুধু ভৌগোলিক আয়তন নয়, সীমান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীরের একটি অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে এবং লাদাখের কিছু এলাকা চিনের নিয়ন্ত্রণে থাকার বিষয়টি দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু।
তাই রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় প্রস্তাব পাশ হলেও ‘ইকুয়াল আর্থ’ বিশ্বের প্রতিটি দেশে বাধ্যতামূলক ভাবে ব্যবহৃত হবে না। নতুন প্রক্ষেপণ কতটা জনপ্রিয় হয় এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলি কী ভাবে সেখানে উপস্থাপিত হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পৃথিবীর চেহারা বদলাবে না, কিন্তু তাকে দেখার চোখ যে বদলাতে চলেছে, তা বলাই যায়।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।