প্রাণ বাঁচল, বাকি সব শেষ হয়ে গেল এক আগুনে

প্রাণ বাঁচল শেষ হয়ে গেল এক আগুনে কলকাতার একটি বস্তির ছোট্ট টিনের ঘরে আমরা তিন জনের বসবাস। আমি, বাবা এবং মা—যিনি কিডনির মারাত্মক অসুখে ভোগেন। বাবা প্রতিদিন ভোরে কাজে বেরিয়ে…

November 25, 2024
1 min read

প্রাণ বাঁচল শেষ হয়ে গেল এক আগুনে

কলকাতার একটি বস্তির ছোট্ট টিনের ঘরে আমরা তিন জনের বসবাস। আমি, বাবা এবং মা—যিনি কিডনির মারাত্মক অসুখে ভোগেন। বাবা প্রতিদিন ভোরে কাজে বেরিয়ে যান, আর আমি মা-কে নিয়ে ঘরেই থাকি। একদিন সকালে যখন বাবা কাজে চলে যান, তখনও আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। হঠাৎ আমার কানে আসতে থাকে চিৎকার-চেঁচামেচি। প্রথমে কিছুই মনে হয়নি, কারণ বস্তিতে এমন ঝগড়াঝাটি তো প্রায়ই হয়। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই কিছু অবিশ্বাস্য ঘটে।

আমার ঘরের মধ্যে ধোঁয়া ঢুকতে শুরু করে। তখনই আমি বুঝতে পারি যে কিছু একটা খারাপ ঘটেছে। আমার অবস্থা হয়ে যায় অন্ধকার, নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। দেরি না করে, আমি তৎক্ষণাৎ মাকে জাগিয়ে বাইরে বের করে আনি। মায়ের অসুস্থতা সত্ত্বেও, তাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসার চেষ্টা করি।

আমরা যে ঘরে থাকি, সেটি বস্তির একটা ছোট্ট টিনের ঘর। এখানে আমাদের অন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। পাশেই ছিল একটি তুলোর গুদাম, যেখানে আগুন লাগে। তাতে পুরো বস্তি জ্বলে উঠতে থাকে। তুলোর আগুনে এমন এক তাপ ছড়ায়, যে আমাদের ঘরেও তার প্রভাব পড়তে থাকে। ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে যেতে থাকে, আমি যেন অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। মাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও, কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারি মা ভিতরেই রয়ে গিয়েছেন। কোনও কিছু না ভেবেই আবার আগুনের ভিতরে ছুটে যাই তাকে বার করতে। এই মুহূর্তে একটুও ভয় না পেয়ে, নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে মাকে উদ্ধার করি।

কিন্তু ঘরটির তখন পুরো একাংশ পুড়ে গিয়েছে। পিঠে আগুনের হলকা লাগে, যা কিছুটা পোড়াতে শুরু করে। কোনও কিছুই করার ছিল না। দৌড়াদৌড়ি করে জল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এত বড় আগুন কি এক-দু’ বালতি জলে নেভানো যায়?

দমকল বিভাগের কর্মীরা এসে যখন আগুন নেভায়, তখন আমাদের ঘরের কোনো কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। ঘরের চাল, আনাজ, টাকা-পয়সা—সব কিছুই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এমনকি, মায়ের চিকিৎসার সমস্ত কাগজপত্রও আগুনের গ্রাসে চলে যায়। আমার মায়ের দুটি কিডনিই প্রায় অকেজো হয়ে গেছে এবং তিনি নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে আছেন। এসএসকেএম হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল, যেখানে প্রতিদিন তাকে অনেক ওষুধ এবং ইনজেকশন দেওয়া হতো—সেগুলোও আগুনে পুড়ে গেছে।

আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, সার্টিফিকেট, সবই অদৃশ্য হয়ে গেছে। সদ্য একটি কাজ পেতে পেরেছিলাম, যে কাজটা আমি কসবার শপিং মলে একটি দোকানে যোগ দেব। কিন্তু এখন আমি জানি না, এই অবস্থায় সেই কাজে যোগ দিতে পারব কি না। এই মুহূর্তে আমি শুধু ভাবছি—প্রাণ তো বাঁচল, কিন্তু সব কিছুই শেষ হয়ে গেল এক আগুনের শিখায়।

এখন আমি একদম একা। কোনও টাকা নেই, কোনও নথিপত্র নেই, এবং মায়ের চিকিৎসার খরচও খুব ভারী হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমি আশাবাদী, কারণ যতোই বিপদ আসুক না কেন, মানুষ যদি আশা হারিয়ে না ফেলে, তাহলে সব কিছু আবার নতুন করে শুরু করা সম্ভব।

আমাদের বস্তির মানুষজনও আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন আমি শুধু একটাই কথা ভাবি—এমন কঠিন মুহূর্তে, যদি আমরা একে অপরকে সহায়তা করি, তাহলে যে কোনও বিপদ অতিক্রম করা সম্ভব। আজকে হয়তো আমাদের ঘর নেই, কিন্তু জীবনের আসল মূল্য তো একে অপরের পাশে থাকার মধ্যেই।

জীবনে কখনও কখনও এমন দুঃখজনক মুহূর্ত আসে, যখন মনে হয় সব কিছু হারিয়ে গেছে। কিন্তু সেই সময়টাতেই মনে রাখতে হয়, হারানোর পরে জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায়।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *