চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল আয়ুষ
কলকাতার বাগুইআটির এক বেসরকারি স্কুলের ছোট্ট ছাত্র আয়ুষ পাইককে হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছেন তার মা নুরজাহান পাইক। মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৪, ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পরিবারটির জন্য অবর্ণনীয় দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয়ুষের মা জানালেন, তার সন্তান দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। সুষ্ঠু চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানি ঘটার এই ঘটনাটি তাঁর কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত এবং গভীর আঘাত দিয়েছে।
নুরজাহান পাইক বলেন, “আমার ছেলে চিকিৎসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিল, কিন্তু কোন হাসপাতাল তাকে গ্রহণ করতে চাইল না। যদি প্রশাসন তৎপর হতো, আমার ছেলে হয়তো বাঁচতো।” দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল সল্টলেকের দু’নম্বর গেটের কাছে উল্টোডাঙার হাডকো মোড়ে। নুরজাহান তার ছোট ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনই পিছন থেকে দ্রুত গতিতে আসা একটি বাস তাদের স্কুটারকে ধাক্কা মারে। এই দুর্ঘটনায় বাচ্চাটি গুরুতর আহত হয় এবং পথেই পড়েছিল। আহত অবস্থায় সে প্রায় ১৫ মিনিট রাস্তার উপর পড়ে ছিল।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ বাহিনী সাহায্য না করায়, নুরজাহান তাঁর পরিবারের লোকদের সহায়তায় ছেলেকে একটি নার্সিংহোমে নিয়ে যান। সেখানে তার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে অক্সিজেন দেওয়া হলেও, নার্সিংহোমে শিশুদের আইসিইউ নেই। এর পর, তারা ছেলেকে দ্রুত ফুলবাগানের বিখ্যাত বি সি রায় শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান, কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা ছেলেকে ভর্তি করতে অস্বীকার করেন। তাদের মতে, আয়ুষের মাথায় যে ধরনের আঘাত ছিল, সে ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা সেখানে ছিল না।
এদিকে, নুরজাহান জানালেন, উল্টোডাঙার নার্সিংহোমে আসার পর বিধাননগর থানার পুলিশ তাঁকে ফোন করে জানিয়েছিল যে, তারা ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে সাহায্য করবে, কিন্তু পুলিশ কর্তারা কোনো সাহায্য দেননি। অবশেষে, আরেকটি নার্সিংহোমে ছেলেকে নিয়ে গেলে, সেখানকার চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন যে, আয়ুষ আর বেঁচে নেই।
নুরজাহান পাইক আরো বলেন, “এমন এক অভিজ্ঞতার পর আমি আর কিছু বলতে পারছি না। আয়ুষকে আমি প্রায় প্রতিদিনই স্কুলে নিয়ে যেতাম। যেখানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে একটিও স্পিড ব্রেকার ছিল না, রাস্তার পাশে ফুটপাত নেই। গাড়ি খুব দ্রুত চলে। ট্র্যাফিক পুলিশও খুব কমই সেখানে দেখা যায়। যদিও কিছু সিভিক ভলান্টিয়াররা মাঝে মাঝে থাকেন, তবুও তাদের সাহায্য খুব কম। এই ধরনের সড়কগুলোতে একাধিক স্কুল রয়েছে এবং পথচারীদের রাস্তার উপর হাঁটতে বাধ্য করা হয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।”
এই ঘটনার পর নুরজাহান পাইক প্রশাসনকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছেন এবং তিনি বলেছেন, “প্রশাসন যদি তৎপর হতো, হয়তো আমার ছেলেটি এখন বেঁচে থাকতো। রাস্তার পাশে ফুটপাতের ব্যবস্থা করলে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, যেন দ্রুত ফুটপাত এবং নিরাপদ রাস্তা তৈরি করা হয়, যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটে।”
এছাড়া, নুরজাহান আরও জানান, তার এলাকায় দুর্ঘটনার পর সাধারণ মানুষও কোনো সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। এই ঘটনায় শুধু প্রশাসনই নয়, বরং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও মনোভাবের অভাবও পরিলক্ষিত হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। রাস্তা নিরাপত্তা নিয়ে তার এই আবেদন অবশ্যই এক কঠিন বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে দুর্ঘটনা ঘটলে জরুরি সেবা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর প্রশাসন কি দ্রুত কোনো পদক্ষেপ নেবে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপদ থেকে বাঁচানো যায় এবং সবার জন্য নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়?