স্মৃতি আর শক্তির খোঁজ
দুর্গাপুজো আসলেই এখন মনে হয়, আনন্দের থেকেও মনখারাপ যেন বেশি ঘিরে ধরে। আগে এই সময় মানেই ছিল পরিবার, নতুন জামাকাপড়, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া আর অন্তহীন গল্প। এখন পুজো মানেই গানের অনুষ্ঠান, বিদেশে অনুষ্ঠান করার ব্যস্ততা। আমি আর জয় এবারও যাচ্ছি আমেরিকা। কিন্তু যতই বাইরে গিয়ে গান গাওয়ার আনন্দ থাকুক, ভেতরে কোথাও একটা খালি খালি লাগে।
মহালয়ার মহিষাসুরমর্দিনী শুনলেই ছোটবেলার দিনগুলো মনে পড়ে যায়। তখন জানতাম, মা-ই নতুন জামা কিনে দেবেন। আজ আর সেই মা নেই। শাশুড়ি মা আর দিদি এখন উপহার দেন, কিন্তু মায়ের দেওয়া জিনিসের শূন্যতা পূরণ হয় না। আগের প্রজন্মের মানুষরা একে একে চলে যাচ্ছেন, সেই শূন্যতাই এখন পুজোর সময়ে আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
আগে বিজয়ার সময়ে প্রণাম করতে যাওয়া নিয়ে কী হইচইই না হত! এখন ফোনেই সব সেরে নিতে হয়। সম্পর্কগুলো যেন ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। বাইরের চাকচিক্যে মুড়ে থাকলেও ভেতরে ভেতরে মানুষ ভালোবাসতে ভুলে যাচ্ছে। আগে যে মিলনমেলা হত, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া হত, সেসব এখন ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে।
আমি নিজে কখনও অঞ্জলি দিইনি, তবে এখন ইচ্ছে করলে দিতে পারি, কারণ অঞ্জলির অর্থটা এখন বুঝি। আমি আচার-অনুষ্ঠানে বিশ্বাসী নই, কিন্তু ঈশ্বরে আস্থা আছে। তাই প্রতি বছরই মা দুর্গার কাছে কিছু না কিছু চাই। এবারের প্রার্থনা— আমার শক্তি যেন ফেরত পাই। মনে হচ্ছে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমি শান্ত হয়ে গেছি, রাগ কমে গিয়েছে, সাহসও কোথাও হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু শান্ত মানুষকে সবাই সুযোগ নেয়। তাই এই পুজোয় আমি চাই, মা আমাকে ফের আমার সেই শক্তি ফিরিয়ে দিন।
পুজোর সময়ে ব্যস্ততা এত বেশি থাকে যে দিন-তারিখও ঠিকমতো মনে থাকে না। খাওয়াদাওয়ারও ঠিক থাকে না। তবুও গান গাইতে গিয়ে মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে অন্য রকম আনন্দ হয়। বিদেশে গিয়ে যদি ভোগের খিচুড়ি মিলে যায়, তাহলে তা যেন বাড়তি সুখের মতো। জয় আর আমি বহু বছর ধরে একসঙ্গে এই অনুষ্ঠানগুলো করছি। বিয়ের আগেও পুজোর অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে যেতাম— সেই দিনগুলো এখনও স্মৃতিতে ভাসে।
পুজো আমার কাছে গান আর নস্টালজিয়ার সমান সমান। একান্নবর্তী পরিবারে পুজো মানেই ছিল মিলনমেলা। নবমীর দিনে পাঁঠার মাংস, অষ্টমীর লুচি— সব কিছুই ছিল বিশেষ। মা-জেঠিমারা সারাদিন লুচি ভাজতেন, হাত ব্যথা হয়ে যেত, কিন্তু আনন্দে কারও মুখ ভার হতো না। বাবা আমাকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে যেতেন, নাগরদোলায় চড়তে পারাটা ছিল বিরাট এক সুখের বিষয়। এখন এসব কিছুই নেই। পরিবারও আর একসঙ্গে নেই। মনে হয়, সময়টা তখন অনেক সহজ ছিল।
আজকাল পুজো নিয়ে নানা বিতর্ক শুনি। কারও সিঁদুরখেলা ভালো লাগে না, কারও রং খেলা পছন্দ নয়। আমি নিজেও এসব করি না। কিন্তু আমার মনে হয়, আনন্দ প্রত্যেকে নিজের মতো করেই খুঁজে নেয়। যার যেমন ভালো লাগে, তেমনই উপভোগ করুক।
আমার কাছে আনন্দ মানে গান। পুজো মানেই সেই গান— ছোটবেলায় পাড়ার মণ্ডপে বাজত, “ললিতা গো, ওকে আজ চলে যেতে বল না।” আজও সে সুর কানে বাজে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই নির্ভার ছোটবেলা।
ওড়িশায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে ইডির তল্লাশি, ১৩৯৬ কোটির প্রতারণা মামলায় উদ্ধার কোটি টাকার সম্পদ