বোয়ালের কালিয়া থেকে বক ফুল ভাজা, দুর্গাপুজোর রান্নাঘরে রসনার মহোৎসব
দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু দেবী আরাধনার সময় নয়, এটি এক আবেগ, ঐতিহ্য আর স্মৃতির মেলবন্ধন। সেই আবেগের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে ভোগ – দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত নানা পদের আহার। পোলাও, খিচুড়ি, নিরামিষ তরকারি তো থাকেই, তবে বহু বাড়িতে ভোগের থালায় সাজানো হয় মাছের নানা পদও, যা পুজোর স্বাদ ও গন্ধকে আরও গভীর করে তোলে।
পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগেই। কেউ ধুনো-গুগ্গুল আর আতরের হিসেব মেলান, কেউ আবার ভাঁড়ার ঘরে চাল, ডাল, ময়দা, চিনির বস্তা ঠিকঠাক ঢুকেছে কি না তা খুঁটিয়ে দেখেন। বছরভর অপেক্ষা করা এই কয়েকটি দিনের জন্যই যেন গোটা বাড়ি প্রাণ ফিরে পায়। পুরনো রাজবাড়িগুলি এই সময় যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
ভোগের ইতিহাস ও বৈচিত্র্য
প্রাচীন পুজোর ভোগের কাহিনি নানা রকম। শোভাবাজার রাজবাড়িতে ষষ্ঠীর দিন থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। চোদ্দো জন হালুইকর মেদিনীপুর থেকে এসে তৈরি করেন নানা মিষ্টি – পক্কান, কটকটি, ক্ষীর তক্তি থেকে শুরু করে লবঙ্গ লতিকা পর্যন্ত। এখন যদিও শিল্পীর অভাবে সংখ্যা কমেছে, তবু আজও দশ-বারো রকম মিষ্টি থাকে নৈবেদ্যের থালায়। এখানে অন্নভোগ দেওয়া হয় না – কুলগুরুর নামে সঙ্কল্প করায় এই নিয়ম আজও অটুট। দশমীর দিনে অবশ্য রাধাবল্লভী, খাস্তা কচুরি আর বিশালাকার পান্তুয়া মাকে নিবেদন করা হয়।
কাশীমবাজার রাজবাড়িতেও ভোগের ঐতিহ্য আজও সমান জাঁকজমকপূর্ণ। সপ্তমীতে সাত মণ, অষ্টমীতে আট মণ, নবমীতে নয় মণ অন্নভোগ রান্না হয়। সপ্তমীতে রুই মাছের ভোগ বিশেষ আকর্ষণ, অষ্টমীতে থাকে নিরামিষের পসরা – আলুর দম, ধোকার ডালনা ইত্যাদি। নবমীর দিন ভোগের থালায় রাজত্ব করে মাছ। ইলিশ থেকে বোয়াল, লাউ চিংড়ি থেকে ঝাল চচ্চড়ি – পদে পদে ধরা পড়ে ও পার বাংলার রান্নার ছোঁয়া।
নানা বাড়ির নানা নিয়ম
বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বাড়িতে অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় রান্না হয় তালপাতার আগুনে খিচুড়ি আর পোড়া ল্যাটা মাছ। চোরবাগানের চ্যাটার্জি বাড়ির ভোগে থাকে পোনা মাছের কালিয়া। এ বাড়ির পুরুষেরাই রান্না করেন ভোগ – খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, অম্বল ও পায়েস সহ নানা পদ।
জঙ্গিপুরের নায়েব বাড়ির ভোগে থাকে লুচি, পোলাও আর পাঁঠার মাংস। ঘোষাল বাড়িতে নিরামিষের পসরা – তিন রকম খিচুড়ি, পনিরের তরকারি আর বক ফুল ভাজা। ট্যাংরার দাসবাড়িতে ভোগে কচুর লতি, আর নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়িতে মরসুমের প্রথম কুলের আচার ও আট রকম বড়ি থাকে নৈবেদ্যে।
বলিপ্রথা ও শেতলভোগের বিবর্তন
সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে বলিপ্রথাও আজ প্রায় প্রতীকী। কোথাও বলির জায়গা নিয়েছে ফল বা মিষ্টি। পাথুরিয়াঘাটার ঘোষ বাড়িতে বলি দেওয়া হয় চিনির মঠ, ট্যাংরায় চালকুমড়ো। সন্ধেবেলায় শেতলভোগে সাধারণত দেওয়া হয় লুচি, পায়েস ও মিষ্টি।
দশমীর বিশেষ আয়োজন
ষষ্ঠীর বোধন থেকে মহানবমীর ভোগের নানা পর্ব পেরিয়ে দশমীর দিন ইলিশ রান্না প্রথা আজও জারি। অনেক বাড়িতে মা-বৌয়েরা ইলিশ খেয়ে তবেই মাকে বরণ করেন – তবে মন্দিরে নয়, ঠাকুরদালানের বাইরে। কোথাও আবার মাকে দেওয়া হয় পান্তা ভোগ, মহাদেবের জন্য পান-তামাক।
শেষ পর্বের রসনা উৎসব
দেবী যখন ফিরে যান জলপথে, তখনও থেমে থাকে না রান্নাঘরের উৎসব। কুচো নিমকি, কটকটি, বোঁদে আর নারকেল ঘুঘনির ঘ্রাণ ভেসে আসে প্রতিটি বাড়ি থেকে। পুজো শেষ হলেও দশমীর সেই মিষ্টিমুখের রেশ বাঙালিকে সারা বছর মনে করিয়ে দেয় – দেবী আসবেন আবার, আর সঙ্গে আসবে রসনার সেই চিরন্তন মহোৎসব।
ব্যালকনির উপর উড়ালপুল! নাগপুরের সেতু স্মরণ করাচ্ছে ভোপালের ৯০ ডিগ্রি রেলসেতুর ঘটনার কথা