ইরানের অস্থিরতায় জঙ্গি শক্তির উত্থানের ভয়!
যুদ্ধ, নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা এবং ক্রমাগত হামলার চাপে এক অদ্ভুত অস্থির সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ইরান। একের পর এক শীর্ষ নেতার মৃত্যু এবং প্রশাসনিক কাঠামোর টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি করেছে এক ধরনের ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’—যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি নতুন কিছু নয়। অতীতে ইরাক এবং সিরিয়া-য় ঠিক এমনই অস্থিরতার সুযোগ নিয়েই শক্তি বাড়িয়েছিল আইএস (ইসলামিক স্টেট)। এখন আশঙ্কা, সেই ইতিহাস যেন আবার না ফিরে আসে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজ়রায়েল-এর সঙ্গে সংঘাতের জেরে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হয়েছেন বা আড়ালে চলে গিয়েছেন। ফলে দেশের শাসনব্যবস্থা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মোজতবা খামেনেই-এর নাম। তিনি নেতৃত্বে এলেও তাঁর অবস্থান কতটা শক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। নেতৃত্বের এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
সমস্যার মূল জায়গাটা এখানেই—যখন কোনও রাষ্ট্র তার সীমান্ত রক্ষা, প্রশাসন পরিচালনা বা নাগরিক পরিষেবা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখনই সেই শূন্যস্থান দখল করতে এগিয়ে আসে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি। বর্তমানে ইরানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এমন পরিস্থিতির আভাস মিলছে বলেই দাবি বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের।
বিশেষ করে আইএস-খোরাসান এই অস্থিরতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে জানা গিয়েছে। যুদ্ধের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষদের মধ্য থেকেই তারা নতুন সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। সংঘাতকে ‘ধর্মীয় লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরে উগ্রপন্থায় দীক্ষিত করার কৌশলও নেওয়া হচ্ছে।
এর পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—ইরান দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম এশিয়ায় বিভিন্ন ‘প্রক্সি’ গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বজায় রেখেছে। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের কারণে সেই গোষ্ঠীগুলির উপর নজর দেওয়া বা তাদের আর্থিক সহায়তা জারি রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইতিহাস বলছে, ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাক-এ যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকেই আল-কায়েদা ও আইএস-এর মতো সংগঠনের উত্থান ঘটে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এখন সতর্ক করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ইরান নয়, গোটা পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতাই প্রশ্নের মুখে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আন্তর্জাতিক বাহিনী নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানও ধাক্কা খেতে পারে। আর ঠিক সেই সুযোগের অপেক্ষাতেই থাকে এমন জঙ্গি সংগঠনগুলি।
সব মিলিয়ে, ইরানের এই অস্থিরতা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়—এটি একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত। এখন দেখার, নেতৃত্ব কত দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। না হলে ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’-এর ফাঁক গলে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।