যানবাহনের গতি বেঁধে দেওয়ার উদ্যোগ
কিছু দিন আগে কলকাতা শহরে পথ নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার সম্প্রতি শহরের যানবাহনের গতি নির্ধারণ করেছে এবং এর ফলে কিছু দুর্ঘটনা রোধের আশা করা হচ্ছে। তবে, এ পদক্ষেপের পাশাপাশি অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও অবহেলিত—পথচারীদের চলাচলের নিরাপত্তা।
সম্প্রতি কলকাতার বড়বাজার এলাকায় একটি দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে মিনিবাসের ধাক্কায় এক পথচারীর মৃত্যু হয়। আরও তিন মহিলা আহত হন। এই দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ ছিল, ফুটপাতে চলাচলের কোন স্থান না থাকা। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে একটি রেলিং ছিল, কিন্তু তা ছিল খুবই ছোট এবং সংকীর্ণ। এর ফলে, পথচারীদের বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর হাঁটতে হয়েছিল, যেখানে বাসগুলো বিপজ্জনকভাবে চলছিল। এমন ঘটনাগুলি শহরের বিভিন্ন অংশে সাধারণ, বিশেষ করে বড়বাজার, শ্যামবাজার, এবং অন্যান্য উত্তর ও মধ্য কলকাতার এলাকায়।
এদিকে, রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন রাস্তার জন্য যানবাহনের গতি নির্ধারণ করা হয়েছে। খড়্গপুর আইআইটি এর পরিকল্পনার অধীনে এই নতুন স্পিড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী জানিয়েছেন, কলকাতার তুলনায় জেলার অন্যান্য অঞ্চলে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, গতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পথচারীদের জন্য নিরাপদ হাঁটার স্থান, অর্থাৎ ফুটপাত, সরবরাহ করার দিকে সরকারের নজর পড়েনি।
নতুন মাপকাঠি অনুযায়ী, শহরের বাইপাস বা ভিআইপি রোডের মতো বৃহৎ রাস্তায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত রাখা যাবে, যেখানে লোকজনের পারাপার কম এবং পথ প্রশস্ত। অন্যদিকে, ঘিঞ্জি রাস্তা, যেখানে পথচারীদের চলাচল বেশি এবং গাড়ির গতি কমানোর প্রয়োজন, সেখানে গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত সীমিত থাকবে। স্কুল বা হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গতি আরো কমিয়ে ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটার করা হয়েছে।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ভার্গব মৈত্র জানিয়েছেন যে, শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় গাড়ির গতি কম রাখা হবে, যাতে দুর্ঘটনার পরিণতি গুরুতর না হয়। তিনি বলেন, “বিজ্ঞানসম্মত ভাবে, ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ির দুর্ঘটনা ঘটলে মৃত্যুর আশঙ্কা কম থাকে। তবে, ফুটপাত যদি যথেষ্ট প্রশস্ত হয়, তবে শহরের গতি আরও বাড়ানো যেতে পারে।”
তবে, যতই গতি বেঁধে দেওয়া হোক না কেন, সঠিকভাবে ফুটপাথের ব্যবস্থা না করা হলে পথচারীদের নিরাপত্তা অটুট থাকবে না। বড়বাজার, শ্যামবাজারের মতো এলাকার ফুটপাথ এখনো দখল হয়ে থাকে স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ীদের হাতে। এর ফলে, পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তার ওপর হাঁটতে শুরু করেন, যেখানে যানবাহন দ্রুতগতিতে চলে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে, গতি সীমিত করা হলেও, দুর্ঘটনা কমানোর আশা করা কঠিন।
এমনকি, স্থানীয় নেতাদের মদতে ফুটপাথ দখলের বিষয়টি রাজ্য প্রশাসনকে বারবার জানানো হলেও তা নিয়ে তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। যদিও পরিবহণমন্ত্রী স্পষ্টভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি, তবে এটি স্পষ্ট যে, শহরের মূল সমস্যার একটি বড় অংশ হল ফুটপাথ দখল।
রাজ্য সরকারের স্পিড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা শহরের সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, তবে এটি একমাত্র সমাধান নয়। একই সঙ্গে, শহরের ফুটপাথগুলোকে পথচারীদের জন্য নিরাপদ করে তোলা, স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজ্য সরকারের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত। এ ছাড়া, সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক, যাতে পথচারী এবং যানবাহনের সহাবস্থান সুরক্ষিত হয়।
সর্বোপরি, সড়ক নিরাপত্তা শুধু যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিষয়—যেখানে পথচারী, যানবাহন এবং সড়কের পরিকল্পনা একসঙ্গে কাজ করে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারে।