নিরুত্তর মেয়র!
ট্যাংরার ক্রিস্টোফার রোডে সম্প্রতি দুটি বহুতল ভবনের হেলে পড়ার ঘটনায় শহরের বাসিন্দারা ক্ষোভে ফুঁসছেন। মেয়র ফিরহাদ হাকিম, যিনি কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং দফতরের দায়িত্বে আছেন, এই বিপর্যয়ের দায় নিয়ে এখনও মুখ খুলতে রাজি হননি। বৃহস্পতিবার তাঁকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি। মেসেজে জিজ্ঞাসা করা হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। এমনকি, স্থানীয় কাউন্সিলর সন্দীপন সাহাও দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ
বুধবার স্থানীয় বাসিন্দারা মেয়রের পদত্যাগের দাবি তোলেন। তাঁদের প্রশ্ন, শহরে একের পর এক বেআইনি নির্মাণের ফলেই তো এই বিপর্যয়। মেয়র এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন এড়িয়ে যাচ্ছেন তাদের দায়িত্ব? এক আবাসিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেআইনি নির্মাণ বন্ধ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতি যে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, এই ঘটনাই তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।”
পরীক্ষা ও রিপোর্ট জমা
বৃহস্পতিবার হেলে পড়া ভবনগুলোতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরসভার দুই স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার পরীক্ষা চালান। তাঁরা একটি ভবনের ছাদ থেকে মাটির দিকে ‘ওলোন দড়ি’ ঝুলিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন, ভবনটি আরও হেলে পড়ছে কিনা তা বোঝার জন্য। রিপোর্ট প্রস্তুত হলে ভবন দু’টি ভেঙে ফেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তাঁরা।
বাসিন্দাদের দুর্দশা
হেলে পড়া ভবনগুলোর মধ্যে একটি ভবনে এখনও আবাসিকরা থাকছেন। বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাদের দুর্দশার সীমা নেই। চারতলার ভাড়াটিয়া বাণী প্রসাদ বলেন, “আমরা আতঙ্কে আছি। কেনা জল দিয়ে কাজ চালাচ্ছি। আমাদের থাকার আর বিকল্প নেই।”
দ্বিতীয় ভবনের বাসিন্দারা ইতিমধ্যেই অন্যত্র সরে গেছেন। আবাসিক রীনা সেনগুপ্ত বলেন, “পুরপ্রতিনিধি অস্থায়ীভাবে জল ও বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু এর পরে কী হবে, সেটাই চিন্তার বিষয়।”
প্রোমোটারদের অনুপস্থিতি
দুটি ভবনের প্রোমোটারই বেপাত্তা। তাঁদের ফোন বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় কাউন্সিলর সন্দীপন সাহা জানান, প্রোমোটারদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ধরনের বেআইনি নির্মাণের জন্য পুরসভা এবং বিল্ডিং দফতরকেও দায় নিতে হবে। তারা যদি আগেভাগে ব্যবস্থা নিত, তাহলে হয়তো এই বিপর্যয় ঘটত না।
বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ
এই ঘটনা নিয়ে বিরোধী দলগুলো শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, “কাটমানির জন্য বেআইনি নির্মাণ চলছে। পুরসভা, মেয়র, কাউন্সিলর— সবাই জড়িত। টাকা তোলার পর তাদের আর কোনো দায়িত্ব থাকে না।”
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, “তৃণমূলের শাসনে বেআইনি নির্মাণ, কাটমানি আর জলাজমি ভরাটের সংস্কৃতি চলছে। গার্ডেনরিচ থেকে ট্যাংরা— সর্বত্রই এই দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে।”
প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র সৌম্য আইচ রায় আরও যোগ করেন, “তৃণমূল নেতাদের কাটমানি দিলেই আইন ভেঙে যা খুশি করা সম্ভব। মানুষের জীবন বিভীষিকাময় করে তুলেছে এই অনুপ্রেরণার উন্নয়ন।”
অভিযোগের পাহাড়
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হেলে পড়া একটি ভবনের নির্মাণ শুরু হয়েছিল বছরখানেক আগে, আর অপরটি চার বছর আগে। দুটি বাড়িই বেআইনি। অথচ বিল্ডিং দফতর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ ধরনের বেআইনি ভবন নির্মাণে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।
উত্তরের অপেক্ষায় শহরবাসী
এই ঘটনার পরেও মেয়রের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সবাই। তাঁদের বক্তব্য, “যদি মেয়র দায় না নেন, তবে এই ধরনের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী কে?” শহরবাসীর জীবন বিপন্ন করে বেআইনি নির্মাণ চালিয়ে যাওয়া আর এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।