নাগরিকত্বের টানাপড়েনে পাঁচ বছরের ভবিষ্যৎ: কানাডায় ফোন কলকাতা হাই কোর্টের, উদ্বিগ্ন বিচারপতিরা

কানাডায় ফোন কলকাতা হাই কোর্টের! এক দিকে ভারতীয় মা, অন্য দিকে কানাডার নাগরিক বাবা। মাঝখানে পাঁচ বছরের এক শিশু— যার ভবিষ্যৎ ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল আইনি ও মানবিক সংকট। জন্মসূত্রে…

December 24, 2025
1 min read

কানাডায় ফোন কলকাতা হাই কোর্টের!

এক দিকে ভারতীয় মা, অন্য দিকে কানাডার নাগরিক বাবা। মাঝখানে পাঁচ বছরের এক শিশু— যার ভবিষ্যৎ ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল আইনি ও মানবিক সংকট। জন্মসূত্রে কানাডার নাগরিক সেই শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল কলকাতা হাই কোর্ট। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মঙ্গলবার আদালত থেকে সরাসরি ফোন করা হল ভিন্‌দেশে থাকা বাবাকে। লক্ষ্য একটাই— বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বে যেন একটি শিশুর জীবন অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে।

ঘটনার শুরু ২০২০ সালে। কানাডায় বসবাসকারী এক বাঙালি দম্পতির কন্যাসন্তান জন্ম নেয় সে দেশেই। ফলে জন্মসূত্রে সে কানাডার নাগরিকত্ব পায়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। মায়ের অভিযোগ, স্বামীর তরফে মানসিক হেনস্থা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কারণে দাম্পত্য জীবন ভেঙে পড়ে। সেই অশান্তির মধ্যেই এক দিন শিশু-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে কানাডা ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন মা।

এখান থেকেই নতুন জটিলতা। শিশুটির কানাডিয়ান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে ৩১ ডিসেম্বর। এখনও সে মায়ের সঙ্গে ভারতে রয়েছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন বাবা। তাঁর দাবি, সন্তানকে কানাডায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি। অন্য দিকে, মা কোনও ভাবেই মেয়েকে ছাড়তে রাজি নন।

মঙ্গলবার বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও মহম্মদ শব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানি চলাকালীন পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিচারপতিরা জানান, বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত বিবাদ তাঁদের আলোচনার বিষয় নয়— আদালতের মূল চিন্তা শিশুর ভবিষ্যৎ। সেই কারণেই এজলাস থেকেই আইনজীবীকে নির্দেশ দেওয়া হয়, কানাডায় থাকা বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে।

ফোনালাপে জানতে চাওয়া হয়, কবে তিনি ভারতে এসে স্ত্রীর সঙ্গে মুখোমুখি বসে সন্তানের অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। তবে বাবার আইনজীবী জানান, তিনি কানাডার নাগরিক হওয়ায় ভিসা পেতে সময় লাগবে। অন্তত এক থেকে দেড় মাসের আগে তাঁর ভারতে আসা সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতিতে বিচারপতি বসাকের মন্তব্য ছিল স্পষ্ট ও মানবিক— “বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বের জন্য কোনও শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে না।” আদালত জানায়, শিশুটি ও তার বাবা দু’জনেই কানাডার নাগরিক হওয়ায় এই বিষয়ে আদালতের ক্ষমতা সীমিত। তবে ভারতীয় নাগরিক মায়ের নিরাপত্তা এবং অধিকারকেও গুরুত্ব দিচ্ছে আদালত।

সমাধানের পথ খুঁজতে আদালত কয়েকটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে— কানাডায় মা ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাবার লিখিত প্রতিশ্রুতি, আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা, সমস্ত আর্থিক দায়ভার বহন, স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া ওই বাসস্থানে প্রবেশ না করা, সীমিত সময়ে বাবার সন্তানের সঙ্গে দেখা, এবং প্রয়োজনে কানাডার আদালতে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা প্রত্যাহার নিয়ে ভাবনা।

এ ছাড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উভয় পক্ষকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ফোন বা ভিডিয়ো কলে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে শিশুটি বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। আগামী জানুয়ারিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত আদালতকে জানাতে হবে দু’পক্ষকেই।

শেষ পর্যন্ত আদালতের আশাবাদ— আলোচনার পথেই সমাধান মিলবে। কারণ এই মামলার কেন্দ্রে কোনও আইনি লড়াই নয়, রয়েছে পাঁচ বছরের এক শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *