নন্দীগ্রামে সেবাশ্রয়ের কড়া পাহারা!
রাজনীতির মানচিত্রে নন্দীগ্রাম শুধু একটি বিধানসভা কেন্দ্র নয়— তৃণমূলের কাছে তা আবেগ আর স্মৃতির এক কঠিন অধ্যায়। সেই নন্দীগ্রামেই এ বার ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ অনুসরণ করে স্বাস্থ্য পরিষেবার বড় উদ্যোগ নিচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী–র বিধানসভা কেন্দ্রে ১৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে ‘সেবাশ্রয়’ শিবির। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সূচনার প্রায় দশ দিন আগেই ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশে নন্দীগ্রামে পৌঁছে গিয়েছেন অভিষেকের দুই বিশ্বস্ত দূত।
তৃণমূলের মুখপাত্র ঋজু দত্ত এবং কলকাতা পুরসভার ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ— দু’জনকেই স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত নন্দীগ্রামের মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে। রবিবার পৌঁছেছেন ঋজু, সোমবার সকালে সুশান্ত। দু’জনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে আলাদা আলাদা ব্লকের দায়িত্ব। নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকের সেবাশ্রয় ক্যাম্প দেখভাল করবেন ঋজু, আর নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের তদারকির ভার সুশান্তের কাঁধে।
এই কর্মসূচির সূত্রপাত হয়েছিল কয়েক মাস আগেই। ‘এক ডাকে অভিষেক’ নম্বরে নন্দীগ্রাম থেকে সেবাশ্রয় চালুর অনুরোধ পৌঁছয় ক্যামাক স্ট্রিটে। ২৭ ডিসেম্বর প্রথম এই কর্মসূচির খবর প্রকাশ্যে আসে। সে দিনই তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক জানান, তিনি নিজেই ১৫ জানুয়ারি নন্দীগ্রামে গিয়ে শিবিরের উদ্বোধন করবেন। ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই স্বাস্থ্য অভিযান।
নন্দীগ্রাম তৃণমূলের কাছে ‘ক্ষতস্থান’। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় ফিরলেও, এখানেই শুভেন্দুর কাছে হেরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই পরাজয়ের পর দলের পর্যালোচনায় উঠে আসে— নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকেই সাংগঠনিক কোন্দল রয়েছে। পাঁচ বছর কেটে গেলেও সেই ক্ষত পুরোপুরি সারেনি বলেই দলের অন্দরমহলের অনেকের মত। তাই সাম্প্রতিক সাংগঠনিক রদবদলে ব্লক সভাপতি পদ তুলে দিয়ে কোর কমিটি গঠন করা হয়েছে— ঠিক যেমনটা বীরভূম বা উত্তর কলকাতার ক্ষেত্রেও করা হয়েছে।
তাহলে ‘সেবাশ্রয়’-এর জন্য এত কড়া নজরদারি কেন? আনুষ্ঠানিক ভাবে ঋজু ও সুশান্ত দু’জনেই বলছেন, অভিষেকের নির্দেশেই তাঁরা গিয়েছেন এবং শিবির শেষ না-হওয়া পর্যন্ত থাকবেন। তবে দলের প্রথম সারির একাংশের মতে, নন্দীগ্রামের সংগঠনের ভিতরে পারস্পরিক বিশ্বাস এখনও পুরোপুরি মজবুত নয়। আশঙ্কা রয়েছে, এই কর্মসূচিতে কোথাও অন্তর্ঘাতের চেষ্টা হতে পারে। এক প্রবীণ নেতার কথায়, “শুধু নন্দীগ্রাম নয়, গোটা পূর্ব মেদিনীপুরেই কার সঙ্গে কার যোগাযোগ আছে, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তাই সামনে থেকে নজরদারির জন্যই দূত পাঠানো।”
ডায়মন্ড হারবারে যে সেবাশ্রয় ক্যাম্পগুলি তৈরি হয়েছে, সেগুলি কার্যত অস্থায়ী হাসপাতাল— আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষার সুবিধা সবই আছে। নন্দীগ্রামেও দু’টি মডেল ক্যাম্পে ঠিক সেই পরিকাঠামোই রাখা হচ্ছে। কলকাতা থেকে প্রতিটি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এসে টানা ১৫ দিন পরিষেবা দেবেন। লক্ষ্য— এই সময়ের মধ্যে লক্ষাধিক মানুষকে স্বাস্থ্য পরিষেবার আওতায় আনা। জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে চাইছে ‘টিম অভিষেক’।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সেবাশ্রয় শুধু মানবিক উদ্যোগ নয়, আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে সংগঠনকে চাঙ্গা করার কৌশলও বটে। শুভেন্দুর ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে অভিষেকের এই পদক্ষেপ যে রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে, তা নন্দীগ্রামের বাতাসেই এখন স্পষ্ট।