তুষারঝড়ে থেমে গেল ‘নিম্সদাই’!
দুর্গম পাহাড় যেন ছিল তাঁর জীবনের আর এক নাম। বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন শৃঙ্গগুলিকে একের পর এক জয় করে ইতিহাস লিখেছিলেন নেপালি-ব্রিটিশ পর্বতারোহী নির্মল ‘নিম্সদাই’ পূরজা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পাহাড়ই কেড়ে নিল তাঁর জীবন। পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকে ভয়াবহ তুষারধসের পর দু’দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।
নেপালের একটি ছোট পাহাড়ি গ্রামে জন্ম নির্মলের। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ের প্রতি অদম্য টান ছিল তাঁর। পরিবারের ঐতিহ্য মেনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেও দুঃসাহসিক অভিযানের নেশাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে পর্বতারোহণের জগতে নিয়ে আসে। গোর্খা ব্রিগেড ও পরে ব্রিটেনের এলিট স্পেশ্যাল ফোর্সে ১৬ বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি পুরোপুরি মন দেন পাহাড় জয়ে।
২০১২ সালে লোবুচে ইস্ট শৃঙ্গ জয়ের মাধ্যমে তাঁর পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু। এরপর এভারেস্ট, কে২-সহ বিশ্বের একের পর এক আটহাজারি শৃঙ্গ জয় করেন। ২০১৯ সালে মাত্র ছয় মাস ছয় দিনে বিশ্বের ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গ জয় করে তিনি বিশ্বরেকর্ড গড়েন। সেই ঐতিহাসিক অভিযানের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল জনপ্রিয় তথ্যচিত্র Fourteen Peaks: Nothing Is Impossible।
নির্মল পূরজার নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একাধিক নজির। তিনিই প্রথম পর্বতারোহী, যিনি মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এভারেস্ট, লোৎসে ও মাকালু— এই তিনটি আটহাজারি শৃঙ্গ জয় করেছিলেন। ২০২১ সালে ন’জন নেপালি পর্বতারোহীর সঙ্গে বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কে২-র প্রথম সফল শীতকালীন আরোহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি।
এ বছরের লক্ষ্য ছিল আরও কঠিন। অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই দ্বিতীয় বার বিশ্বের ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গ জয় করে নতুন ইতিহাস গড়তে চেয়েছিলেন নিম্সদাই। সেই লক্ষ্যেই প্রথমে গাশারব্রাম-২ (জি২) শৃঙ্গ জয় করেন। পরে পরিকল্পনা বদলে ব্রড পিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের শেষ সমাজমাধ্যম পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, এই অভিযান পূর্বনির্ধারিত ছিল না, তবে সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, কোনও পাহাড়কেই তিনি কখনও হালকাভাবে নেন না; তাঁর একমাত্র প্রার্থনা ছিল নিরাপদে শিখরে ওঠা এবং ফিরে আসা।
ব্রড পিক অভিযানে তাঁর নেতৃত্বে ছিলেন মোট ১০ জন পর্বতারোহী। বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীদের নিয়ে গঠিত সেই দল বৃহস্পতিবার ভয়াবহ তুষারধসের কবলে পড়ে। প্রায় ৬,৬০০ মিটার উচ্চতায় শেষ বার তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এরপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং আলপাইন ক্লাব অফ পাকিস্তানের যৌথ উদ্ধার অভিযান শুরু হলেও প্রবল প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বারবার তুষারঝড়ের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। শেষ পর্যন্ত দু’দিন পর নির্মল পূরজাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
শুধু রেকর্ড গড়াই নয়, পর্বতারোহণের জগতে নেপালি শেরপাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতেও বারবার সরব হয়েছিলেন নিম্সদাই। ২০১৯ সালে এভারেস্টে ভয়াবহ ভিড়ের যে ছবি তিনি তুলেছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে এবং পর্বতারোহণের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করে। নিজের প্রতিষ্ঠিত ‘নিম্সদাই ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে পর্বতারোহীদের নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং শেরপাদের অধিকার নিয়েও কাজ করছিলেন তিনি। ব্রড পিক অভিযান সফল হলে তার সমস্ত উপার্জনও সেই সংস্থার কাজে দান করার কথা জানিয়েছিলেন।
তবে শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণই থেকে গেল তাঁর নতুন ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন। যে পাহাড় তাঁকে বিশ্বজোড়া পরিচিতি, সম্মান এবং অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছিল, সেই পাহাড়ের বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন নির্মল ‘নিম্সদাই’ পূরজা। তাঁর মৃত্যু শুধু পর্বতারোহণ জগতের নয়, দুঃসাহস, অধ্যবসায় ও অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার এক অনন্য প্রতীকের অবসান।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?