ট্রু কলার ‘ট্রু’ নয়!
ট্রু কলার, একটি জনপ্রিয় অ্যাপ যা ফোন নম্বর চেনার কাজে অনেকেই ব্যবহার করেন। এটি প্রায়শই সঠিক তথ্য সরবরাহ করে, তবে সাইবার অপরাধীরা এখন এই অ্যাপের মাধ্যমে মানুষকে ঠকানোর নতুন উপায় আবিষ্কার করেছে। এই ডিজিটাল প্রতারণার জালে ফেঁসে অনেকেই আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
একটি প্রতারণার ঘটনা
এক রবিবার দুপুরে, বেহালার এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী অচেনা নম্বর থেকে ফোন পান। তিনি ট্রু কলারে নম্বরটি চেক করেন এবং স্ক্রিনে এক আইপিএস অফিসারের নাম দেখেন। ভয় পেয়ে ফোন ধরতেই অপরিচিত এক কণ্ঠস্বর শোনেন, যিনি নিজেকে মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার বলে পরিচয় দেন।
প্রথমে কিছু সাধারণ প্রশ্ন করার পর বলা হয়, ওই যুবক মাদক পাচারে যুক্ত বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। তাঁকে জানানো হয়, এখনই তাঁকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে কথোপকথনের শেষে পুলিশ সেজে প্রতারকেরা সমাধান হিসাবে ‘ডিজিটাল জামিনের’ কথা বলে। একটি লিঙ্কে ক্লিক করতে বলা হয়, যা থেকে ভিডিয়ো কলে ‘আইনজীবী’র সঙ্গে কথা বলা যায়। সেই ভিডিয়ো কলের ‘থানা’র পরিবেশ এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে ওই যুবক ভুয়ো প্রতারণা বুঝতে পারেননি। জামিনের নাম করে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে প্রতারকদের পাতা ফাঁদে পড়ে যান।

কেন ট্রু কলার বিপজ্জনক হতে পারে?
ট্রু কলার মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেই ডেটাবেসের উপর ভিত্তি করে নম্বরের পরিচয় দেখায়। সাইবার প্রতারকেরা সহজেই এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করছে। একটি নতুন সিম কার্ড কিনে পরিচিত কিছু লোককে ওই সিমে ভুয়ো নাম সেভ করতে বলা হয়। ফলস্বরূপ, ট্রু কলারে ওই নম্বরটি সেই ভুয়ো নামেই প্রদর্শিত হয়।
ডিজিটাল গ্রেফতারের ফাঁদ
এই ফাঁদে প্রতারকেরা ভয় সৃষ্টি করে। ফোন এবং ভিডিয়ো কলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যাতে মনে হয়, এটি একটি আসল পুলিশি তদন্ত। থানার পরিবেশের আওয়াজ, ভারী কণ্ঠস্বর—সবই পরিকল্পিত। এরপর জামিনের কথা বলে টাকা দাবি করা হয়।
অনেক সময় প্রতারণার সময় ভুক্তভোগীর ফোন বা ল্যাপটপ হ্যাক করে নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। ট্রোজান ভাইরাস ব্যবহার করে ফোনে স্ক্রিন শেয়ার করানোর ফাঁদ পাতা হয়। এর মাধ্যমে প্রতারকেরা ভুক্তভোগীর ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করে এবং মেসেজ, ফোন কল বা অন্যান্য তথ্য চুরি করে।
কীভাবে রক্ষা পাওয়া যাবে?
সাইবার বিশেষজ্ঞরা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন:
- অপরিচিত নম্বর নিয়ে সচেতন থাকুন: ট্রু কলারে দেখানো তথ্য সবসময় সঠিক নয়।
- অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করবেন না: অজানা উৎস থেকে আসা লিঙ্কে ক্লিক করলে বিপদ আসতে পারে।
- স্ক্রিন শেয়ার করবেন না: ভিডিয়ো কল বা অন্য কোনও মাধ্যমে কখনও স্ক্রিন শেয়ার করবেন না।
- ডিজিটাল গ্রেফতার বিশ্বাস করবেন না: ভারতীয় আইনে ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ বলে কিছু নেই। পুলিশ শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করতে পারে না।
- সন্দেহজনক ফোনের ক্ষেত্রে পুলিশকে জানান: এ ধরনের ফোন এলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
সতর্কতা এবং সচেতনতা জরুরি
সাইবার অপরাধীরা মানুষের ভয় এবং বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণা চালায়। তাই ট্রু কলার বা অন্য অ্যাপ ব্যবহার করার সময় সতর্ক থাকুন। তথ্য যাচাই না করে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না।
শেষ কথা
সাইবার প্রতারণা প্রতিরোধের একমাত্র উপায় সচেতনতা। আপনার স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার জন্য সব সময় সতর্ক থাকুন। প্রতারণার ফাঁদে পা দিলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপেও ভুগতে হতে পারে। তাই, কোনও ফোনে হঠাৎ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে মাথা ঠান্ডা রাখুন এবং দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নিন।
বাড়ির লাগোয়া জমিতে সবজি বাগান করতে চান? বীজ পোঁতার আগে মনে রাখুন এই ৫টি বিষয়