জাল ওষুধের বাড়বাড়ন্ত!
দেশজুড়ে জাল ও নিম্নমানের ওষুধের ব্যবসা ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, এমনটাই স্বীকার করল ওষুধ ব্যবসায়ীদের অন্যতম প্রধান সংগঠন ‘বেঙ্গল কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিসিডিএ)। প্রতিযোগিতার দৌড়ে টিকে থাকতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী যাচাই-বাছাই না করেই ওষুধ বিক্রি করছেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বৃহস্পতিবার রাতেই কড়া নির্দেশিকা জারি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যেসব ওষুধ মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলোর তালিকা প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল, ওষুধের পাইকারি বিক্রেতা, ডিস্ট্রিবিউটর এবং সেন্ট্রাল মেডিক্যাল স্টোরকে জানাতে হবে। একইসঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে এই নিম্নমানের ওষুধ কোথাও বিক্রি বা ব্যবহার না হয়।
স্বাস্থ্যদফতরের কড়া নজরদারি
‘সেন্ট্রাল ড্রাগ স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন’ (সিডিএসসিও)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, গত তিন মাসে প্রায় ৩০০টি ওষুধ গুণগত মানের পরীক্ষায় ফেল করেছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক সংস্থার ওষুধও রয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হওয়ায় স্বাস্থ্যদফতর নির্দেশ দিয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং ওষুধের দোকানে প্রকাশ্যে এই নিম্নমানের ওষুধের তালিকা ঝোলাতে হবে। এছাড়া, স্বাস্থ্য দফতরের ওয়েবসাইটেও এই তালিকা প্রকাশ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই জানতে পারেন কোন ওষুধ কেনা নিরাপদ এবং কোনটা নয়।
এর পাশাপাশি, রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আচমকা পরিদর্শনের মাধ্যমে খতিয়ে দেখতে, কোনো দোকানে নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে কি না। যদি কেউ এই নির্দেশ লঙ্ঘন করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেসব ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার ওষুধ পরীক্ষায় ফেল করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসচিব।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ ও সতর্কতা
ওষুধ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিসিডিএ-ও স্বীকার করছে, এই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সংগঠনের মুখপাত্র শঙ্খ রায়চৌধুরী বলেন, “জাল ও ভুয়ো ওষুধ শুধু সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য নয়, পুরো ওষুধ শিল্পের জন্য ক্ষতিকর। এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত প্রশাসনের সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।”
তাদের দাবি, ভারতে উৎপাদিত প্রায় ৩৫% জাল ওষুধ বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু ভারতেই নয়, মিশর ও চীন থেকেও বিপুল পরিমাণে জাল ওষুধ আসছে।
সংগঠনের তরফে আরও বলা হয়েছে, বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো ২০-৩০% পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে, যার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা অনেক সময় যাচাই না করেই ওষুধ কিনে নিচ্ছেন। আর সেখানেই অনুপ্রবেশ করছে জাল ও নিম্নমানের ওষুধ। বিসিডিএ-এর সম্পাদক পৃথ্বী বসু বলেন, “ওষুধের দাম কমানো জরুরি, তবে সেটা গুণগত মানের সঙ্গে আপস করে নয়। ওষুধের উপর থেকে জিএসটি তুলে দিলে দাম কমবে, এবং জাল ওষুধের সমস্যা কমতে পারে।”
জাল ওষুধ ঠেকাতে করণীয়
জাল ওষুধ চিহ্নিত করাই বড় সমস্যা। বিসিডিএ-এর মতে, ব্যবসায়ীরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না, কোন ওষুধ আসল আর কোনটা নকল। সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্য যদি জাল ওষুধ বিক্রির দায়ে ধরা পড়ে, তবে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়।
বর্তমানে দেশে মাত্র ৩০০টি ওষুধে বারকোড দেওয়া হয়েছে, যা জালিয়াতি ঠেকানোর একটি উদ্যোগ। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, সেটাও যথেষ্ট নয়, কারণ বারকোডযুক্ত ওষুধেরও নকল তৈরি হচ্ছে। তাই, বিসিডিএ-এর দাবি, সিডিএসসিও-কে আরও কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে। তারা ড্রাগ কন্ট্রোলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে ইচ্ছুক, যাতে জাল ওষুধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সচেতনতার প্রয়োজন
বিসিডিএ জানিয়েছে, ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ— সবাইকে সচেতন করা প্রয়োজন। তারা প্রতিটি জেলায় প্রচার চালাবে, যাতে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা জাল ওষুধ চেনার পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র প্রশাসনের কড়া নজরদারির ওপর নির্ভর করলে চলবে না, জনগণকেও সচেতন হতে হবে। জাল ওষুধে ক্ষতির শিকার হওয়ার আগে, ক্রেতাদের নিজস্ব সতর্কতাও প্রয়োজন।
ভারতের উপর পাল্টা শুল্ক চাপাচ্ছেন ট্রাম্প! ঘোষণা করলেন নির্দিষ্ট তারিখও