জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যই কি বাড়ছে এল নিনোর দাপট?
এ বছর আবার ফিরে এসেছে এল নিনো। আবহবিদদের আশঙ্কা, এটি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো পর্ব হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলির উপর। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনও স্পষ্ট নয়—জলবায়ু পরিবর্তন কি এল নিনোকে আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র করে তুলছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে মতভেদ।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের একটি স্বাভাবিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা কয়েক বছর অন্তর দেখা দেয়। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায় এবং তার প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় পড়ে। কোথাও খরা, কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও তাপপ্রবাহের প্রকোপ বেড়ে যায়।
গত কয়েক দশকে এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বহু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। একাংশ বিজ্ঞানীর মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন। তাঁদের যুক্তি, শিল্পায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে, যার প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই অতিরিক্ত উষ্ণতা এল নিনোর প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
চিনের গবেষক Wenju Cai-এর নেতৃত্বে হওয়া এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা বেড়েছে। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে।
অন্যদিকে, সব বিজ্ঞানী এই মতের সঙ্গে একমত নন। অনেক গবেষকের মতে, এল নিনো নিজেই অত্যন্ত জটিল একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। মহাসাগর, বায়ুমণ্ডল, বায়ুচাপ এবং সমুদ্রস্রোতের পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে এটি তৈরি হয়। তাই শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে যথেষ্ট প্রমাণসাপেক্ষ নয়।
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এল নিনোর স্বাভাবিক ওঠানামার মধ্যেই বর্তমানে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তার অনেকটাই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তাঁদের যুক্তি, পর্যাপ্ত দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভান্ডার না থাকায় নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
সমস্যা হল, এল নিনো নিয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য খুব বেশি পুরনো নয়। মূলত ১৯৫০ সালের পর থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তার আগে নাবিকদের ডায়েরি, ঐতিহাসিক নথি এবং সীমিত পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করেই গবেষণা করতে হয়। ফলে শতাব্দীব্যাপী তুলনামূলক বিশ্লেষণ এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ণ।
তবে বিজ্ঞানীদের মতভেদ থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত—উষ্ণ পৃথিবীতে এল নিনোর প্রভাব আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই বেড়েছে। তার উপর এল নিনোর অতিরিক্ত উষ্ণতার প্রভাব যুক্ত হলে তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
এল নিনো আসলে কী?
সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন উষ্ণ জল পূর্ব দিকে ফিরে গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছে জমা হয়। এর ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জল অস্বাভাবিক ভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকেই বলা হয় এল নিনো।
স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’-র অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। দক্ষিণ আমেরিকার মৎস্যজীবীরাই কয়েক শতক আগে প্রথম এই অস্বাভাবিক সমুদ্রস্রোত লক্ষ্য করেছিলেন এবং তার নামকরণ করেছিলেন।
বিজ্ঞানীরা এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনোকে কতটা প্রভাবিত করছে, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর না মিললেও একটি বিষয় স্পষ্ট—এল নিনো এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগল প্রভাবে আগামী বছরগুলিতে আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হতে পারে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?