চালকহীন গাড়িতেই এল নতুন প্রাণ!
প্রযুক্তির দুনিয়ায় প্রতিদিনই নতুন নতুন বিস্ময়ের সাক্ষী হচ্ছে বিশ্ব। কিন্তু এ বার যা ঘটল, তা যেন কল্পবিজ্ঞানের গল্পকেও হার মানাল। হাসপাতালে যাওয়ার পথে প্রসবযন্ত্রণা শুরু হওয়ায় চলন্ত স্ব-চালিত গাড়ির মধ্যেই সন্তানের জন্ম দিলেন এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা। অবাক করার বিষয়, কোনও চালক ছাড়াই সেই ‘রোবট’ গাড়িই মা ও নবজাতককে নিরাপদে পৌঁছে দিল হাসপাতালে। ঘটনাটি ঘটেছে আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরে এবং ইতিমধ্যেই তা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার রাতে ওই মহিলা সান ফ্রান্সিসকোর একটি হাসপাতালে যাওয়ার জন্য ‘ওয়েমো’ নামের স্ব-চালিত গাড়ি পরিষেবা ব্যবহার করেন। ওয়েমো মূলত গুগলের প্যারেন্ট সংস্থা অ্যালফাবেটের অধীনস্থ একটি সংস্থা, যারা চালকহীন ট্যাক্সি পরিষেবা দিয়ে থাকে। নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর এবং ডিজিটাল ম্যাপের সাহায্যে গাড়িটি নিজেই চলাচল করে।
যাত্রা শুরুর কিছু সময় পরেই পরিস্থিতি আচমকা বদলে যায়। মাঝপথে ওই মহিলার তীব্র প্রসবযন্ত্রণা শুরু হয়। ঠিক সেই সময় গাড়িতে কোনও চালক বা সহযাত্রী ছিলেন না। শুধু স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির উপরই নির্ভর করছিল গোটা যাত্রা। ওয়েমোর রিমোট রাইডার সাপোর্ট টিম গাড়ির অভ্যন্তরে ‘অস্বাভাবিক নড়াচড়া’ শনাক্ত করে। সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা ফোন করে যাত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনও সাড়া না পাওয়ায় সংস্থার তরফে দ্রুত পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পরে জানা যায়, ফোন ধরতে না পারার কারণ ছিল আরও নাটকীয়। হাসপাতালে পৌঁছনোর আগেই গাড়ির পিছনের আসনেই সন্তান জন্ম দেন ওই মহিলা। প্রসবের পর তিনি কিছুক্ষণের জন্য প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। তবে প্রযুক্তির নির্ভুলতা এবং পরিকল্পনার জোরেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব হয়। স্ব-চালিত গাড়িটি কোনও বিভ্রান্তি ছাড়াই নিজের নির্ধারিত রুট ধরে চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত মা ও নবজাতককে নিরাপদে পৌঁছে দেয় হাসপাতালে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান ফ্রান্সিসকো হাসপাতালের মুখপাত্র জেস বার্থোল্ড পরে জানান, সোমবার রাতেই মা ও শিশুকে হাসপাতালে আনা হয় এবং দু’জনেই আপাতত সুস্থ আছেন। চিকিৎসকেরা দ্রুত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করেন। এই অস্বাভাবিক প্রসবের ঘটনা চিকিৎসকদের কাছেও ছিল অভূতপূর্ব।
তবে ঘটনার আর একটি দিকও সামনে এসেছে। গাড়ির ভিতরে সন্তানের জন্ম হওয়ায় আসনে রক্ত লেগে যায়। সেই কারণে ওয়েমো সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, সংশ্লিষ্ট গাড়িটিকে আপাতত পরিষেবা থেকে সরিয়ে নিয়ে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত ও পরিষ্কার করার কাজ চলছে।
এই ঘটনার পরে ওয়েমোর এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “মানুষের জীবনের ছোট-বড় মুহূর্তে পাশে থাকতে পারাই আমাদের লক্ষ্য। এই নতুন পরিবারকে আমরা শুভেচ্ছা জানাই। মা ও শিশুকে নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পেরে আমরা গর্বিত।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, প্রযুক্তি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, কখনও কখনও তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষীও হয়ে উঠতে পারে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটমাধ্যমে শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যায়। অনেকেই একে প্রযুক্তির জয় বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন— এমন পরিস্থিতিতে স্ব-চালিত গাড়ির ভিতরে চিকিৎসা সহায়তার কোনও ব্যবস্থা থাকা উচিত কি না। সব মিলিয়ে, সান ফ্রান্সিসকোর এই ঘটনা ভবিষ্যতের যাতায়াত ও স্বাস্থ্যসেবার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে বিশ্বকে।