কালী পুজোয়
কলকাতার দুর্গা পুজোর রঙিন উন্মাদনা যতটা দৃষ্টিনন্দন, কালী পুজোর ক্ষেত্রে সেই একই জাঁকজমক দেখা যায় না। বিশেষ করে শহরের কিছু এলাকা বাদ দিলে কালী পুজো তেমনই সাধারণভাবে পালিত হয়। তবে মধ্য কলকাতার একটি বড় অংশে কালী পুজোর আয়োজনের পেছনে সাবেক কংগ্রেস নেতাদের প্রভাব বেশ চোখে পড়ে। বর্তমানে এই সব পুজো তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তবে কিছু পুজোয় এখনও অন্যান্য দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
গত বছর দুর্গা পুজোর সময় বিজেপি একটি বিশেষ কৌশল নিয়েছিল। চলতি বছর, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের নির্যাতিতা তরুণী চিকিৎসকের বিচারের দাবিতে বিজেপি কালী পুজো থেকে কিছুটা দূরে থাকার চেষ্টা করেছিল। তবে এই কালী পুজোয় তৃণমূল কংগ্রেসকে সমানভাবে টক্কর দেওয়ার প্রচেষ্টা কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছে বলে দাবি করছে রাজ্য বিজেপির একটি অংশ।
মধ্য কলকাতায় কালী পুজোর আয়োজনের ক্ষেত্রে সাবেক কংগ্রেস নেতাদের প্রভাব এখনো অদৃশ্য হয়নি। বিশেষ করে, প্রয়াত সোমেন মিত্রের পুজোয় এখনও সব দলের প্রতিনিধিরা ডাক পান। এই এলাকার আদি বাসিন্দা হওয়ার কারণে এবং পুর-প্রতিনিধি হিসেবে, বিজেপি নেতা তাপস রায়ের প্রভাব রয়েছে বেশ কয়েকটি পুজোর উপর।
তাপস রায়ের যুবশ্রী ক্লাবের কালী পুজোর উদ্বোধন করেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তমলুকের বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এবং অন্যান্যরা। এই পরিস্থিতিতে, বিজেপি নেতাদের দাবি যে তারা তৃণমূলের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলছে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এছাড়া, বিজেপির উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষের নিজের একটি কালী পুজো রয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী তার উদ্বোধন করেছেন। এর বাইরে, পশ্চিম বর্ধমান, নদিয়া এবং পূর্ব মেদিনীপুরের বিভিন্ন পুজোও উদ্বোধন করেছেন তিনি। তমোঘ্ন ঘোষের কথায়, “মধ্য কলকাতায় আমরা তৃণমূলের সঙ্গে কড়া টক্কর দিচ্ছি! আবার অনেক পুজো রয়েছে, যেখানে সব দলের প্রতিনিধিরাই যুক্ত রয়েছেন।”
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষের মতে, “এটা মধ্য কলকাতার ঐতিহ্য। চিরকাল হয়ে এসেছে। তবে এটা রাজনৈতিক নয়। ব্যক্তিগত প্রভাবে কিছু পুজো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তখন আর সেটা দল বনাম দল থাকে না।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি একটি শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করেছেন, যা এই অঞ্চলের পুজোর ইতিহাসকে তুলে ধরে।
অবশ্য, তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, তা কালী পুজোকে কেন্দ্র করে স্পষ্ট। মধ্য কলকাতার বিভিন্ন পুজোর উদ্যোক্তারা তাদের পুজোয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি নিয়ে যে ধরনের উন্মাদনা দেখাচ্ছেন, তা ভবিষ্যতে কলকাতার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
মধ্য কলকাতার কালী পুজো গুলি মূলত একটি সামাজিক মিলনমেলা হয়ে উঠেছে। যেখানে একদিকে ধর্মীয় অনুভূতি, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি একত্রিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে এক অদৃশ্য লড়াইয়ের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে।
কালী পুজোর সময় প্রতিটি দলের উপস্থিতি এবং সক্রিয়তা, দর্শকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পুজোর গুণগত মান এবং সেটির সাংস্কৃতিক অবদান। কালী পুজোকে কেন্দ্র করে সব দলের কর্মসূচি, দর্শনার্থীদের মধ্যে এক ভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে।
এভাবে, কলকাতার কালী পুজো এই বছর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের একটি মুখর চিত্র। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে এই টক্কর কেবল রাজনৈতিক নয়, এটি সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পরিচয়ের একটি অংশ। আগামী দিনে এই প্রতিযোগিতা কলকাতার পুজো সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করতে পারে।
অবশেষে, কালী পুজোর আয়োজন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি শহরের রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবনকে প্রতিফলিত করে। এই পুজো আসলে কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ভবিষ্যতে এটি রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি সামাজিক সমন্বয়েরও ভূমিকা রাখতে পারে।