কড়ে আঙুলের ফোঁটা: ভাইফোঁটার শাস্ত্র এবং অর্থ

কড়ে আঙুলের ফোঁটা ভাইফোঁটা আমাদের সংস্কৃতির একটি বহমান উৎসব। এটি কেবল একটি আনন্দময় রীতি নয়, বরং এই উৎসবের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় অর্থ। এই উৎসবে যখন বোন তার…

November 3, 2024
1 min read

কড়ে আঙুলের ফোঁটা

ভাইফোঁটা আমাদের সংস্কৃতির একটি বহমান উৎসব। এটি কেবল একটি আনন্দময় রীতি নয়, বরং এই উৎসবের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য ও শাস্ত্রীয় অর্থ। এই উৎসবে যখন বোন তার ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেয়, তখন সেই ফোঁটার মাধ্যমে ভাই-বোনের সম্পর্কের মাধুর্য ও প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ ঘটে। তবে প্রশ্ন জাগে, কেন কড় আঙুল দিয়েই ফোঁটা দেওয়া হয়? আসুন, জানি এর পেছনে কি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা রয়েছে।

ভাইফোঁটার কাহিনী পুরনো। এক রাজপুরীতে এক ভাই তার বোনের জন্য অপেক্ষা করছিল। দীপাবলির দিনে, যখন বোনের দেখা মিলল না, তখন ভাইটি মা-কে স্মরণ করে পথে নামল। দীর্ঘ যাত্রা শেষে বোনের বাড়িতে পৌঁছানোর পর, বোন তার ভাইকে কপালে ফোঁটা দিয়ে বরণ করে নেয়। এর পরে তারা একে অপরের জন্য সারা জীবন ভালোবাসা ও নিরাপত্তার প্রার্থনা করে। এই মিলনমুহূর্ত থেকেই ভাইফোঁটার উৎসবের সূচনা।

যম ও যমুনা, সূর্যদেব এবং সংজ্ঞার সন্তান, তাঁদের এই ভাই-বোনের সম্পর্কের ইতিহাসও ভাইফোঁটার সাথে যুক্ত। সংজ্ঞা, সূর্যদেবের প্রথম পত্নী, সূর্যের তাপ সহ্য করতে না পেরে সন্তানদের যমজ বোন ছায়ার হাতে দিয়ে নির্বাসনে চলে যান। এই সুযোগ নিয়ে ছায়া সূর্যদেবকে আকৃষ্ট করেন এবং তাঁদের সন্তান হয়। পরবর্তীতে যমুনা ও যমের মিলন ঘটেছিল কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয় দিনে, যেদিন ভাইফোঁটার উৎসবের সূচনা হয়।

এখন প্রশ্ন আসে, কড় আঙুল দিয়ে কেন ফোঁটা দেওয়া হয়? শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, হাতের পাঁচটি আঙুল ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোমের প্রতিনিধিত্ব করে। কড়ে আঙুলের মাধ্যমে ফোঁটা দেওয়ার অর্থ হল ভাই-বোনের মধ্যে ভালবাসা ও প্রীতি যেন আকাশের মতো বিশাল ও ব্যাপ্ত হয়। অর্থাৎ, একে অপরের প্রতি কোনো কিছু গোপন করা যেন না হয়, বরং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা একে অপরের মধ্যে সীমানা অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়।

এছাড়াও, কড়ে আঙুলের ফোঁটা দেওয়ার সময় বোনটি চন্দন বা দইয়ের প্রলেপ ব্যবহার করে মন্ত্রপাঠ করে। এই মন্ত্রটি মূলত আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য হয় এবং এটি ভাইয়ের জন্য দীর্ঘায়ু এবং সৌভাগ্য কামনা করে। অনুষ্ঠানের শেষে, দূর্বাঘাস ও ধানের শিষ থাকে আশীর্বাদের প্রতীক হিসেবে, এবং ভাই-বোন একে অপরকে প্রণাম করে মিষ্টি মুখে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।

ভাইফোঁটার এই প্রথা শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি ভাই-বোনের সম্পর্ককে শক্তিশালী করার একটি অনন্য উপায়। এই ফোঁটার মাধ্যমে তারা একে অপরের জীবনের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে ওঠে। দীপাবলির রূপালী আলোয়, এই ভাইফোঁটা যেন এক নতুন আশা ও প্রেরণার বার্তা নিয়ে আসে।

এভাবেই, কড়ে আঙুল দিয়ে ফোঁটা দেওয়ার প্রথা আমাদের সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ভাই-বোনের মধ্যে স্নেহ ও ভালোবাসাকে উজ্জীবিত করে এবং আমাদের শেকড়ের সঙ্গে এক নতুন জড়তা সৃষ্টি করে। ভাইফোঁটার এই উৎসব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে সম্পর্কের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সেটিই আমাদের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *