প্রাকৃতিক রোষ, নাকি মানুষেরই ভুল?
উত্তর ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নজির নতুন নয়। ২০১৩ সালের ভয়াবহ কেদারনাথ দুর্যোগের স্মৃতি এখনও বহু মানুষের মনে তাজা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিপর্যয়ের মাত্রা ও ঘনত্ব উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। হিমালয়ের কোলে থাকা উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরের মতো রাজ্যগুলো পর্যটনের জন্য বিখ্যাত হলেও গত কয়েক মাসে তারা ভয় আর আতঙ্কের সমার্থক হয়ে উঠেছে। পাহাড়ি গ্রামগুলির সৌন্দর্য মুছে দিয়েছে মেঘভাঙা বৃষ্টি, হড়পা বান, ধসের মতো একের পর এক দুর্যোগ।
মাত্র আগস্ট মাসেই একাধিক এলাকায় প্রকৃতি যেন মৃত্যুদূতের রূপ নিয়েছে। ৫ আগস্ট উত্তরকাশীর ধরালীতে মেঘভাঙা বৃষ্টির জেরে ক্ষীরগঙ্গা নদীর জলোচ্ছ্বাসে গ্রামগুলি তছনছ হয়। ৬ আগস্ট হিমাচলের কিন্নৌরে হড়পা বানে ভেসে যায় অস্থায়ী সেতু; আটকে পড়া শত শত তীর্থযাত্রীকে জ়িপলাইনে উদ্ধার করা হয়। ১৪ আগস্ট জম্মু-কাশ্মীরের কিশ্তওয়াড়ে ভয়ঙ্কর বানের পর ডোডা, রেইসি, কাঠুয়ার মতো এলাকাতেও ধ্বংসযজ্ঞ চলে। মাসের শেষে রামবনের রাজবাগে ধসে ভেঙে পড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়, বহু মানুষ প্রাণ হারান বা নিখোঁজ হন। সরকারি তথ্য বলছে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে মাসের শেষ অবধি শুধুমাত্র জম্মু-কাশ্মীরে মৃত্যু হয়েছে ১৩৮ জনের, হিমাচলে গত দু’মাসে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২০০ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। অতিবৃষ্টির প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। হিমাচলে বৃষ্টি হয়েছে গড়ের তুলনায় ১১% বেশি, জম্মু-কাশ্মীরে গত সপ্তাহেই স্বাভাবিকের ২৬০% বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিও প্রকৃতিকে অস্থির করছে। গরম ও ঠান্ডা হাওয়ার সংঘর্ষে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ঘটছে, ফলে মাটি আলগা হয়ে ধস নামছে এবং নদীগুলি ভরছে প্রাণঘাতী স্রোতে।
তবে কেবল প্রকৃতির ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানো যায় না। পাহাড়ে নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণকাজ, যত্রতত্র গাছ কাটা এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘন পরিস্থিতি ভয়াবহ করেছে। পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নের নামে পাহাড়ের ঢাল কেটে রাস্তা, হোটেল, জনপদ গড়া হয়েছে। চারধাম প্রকল্পের মতো বৃহৎ অবকাঠামো তৈরিতে হাজার হাজার গাছ কাটা ও সুড়ঙ্গ তৈরিতে ‘ব্লাস্টিং’ করা পাহাড়কে ভঙ্গুর করেছে। হিমবাহের গলনে তৈরি হ্রদগুলিও হঠাৎ বানের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
পরিবেশবিদদের মতে, হিমালয় ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থির অঞ্চল; তবুও নির্মাণের নামে তার ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে নদীর তীরে দেদার নির্মাণ চলছে। কেদারনাথ বিপর্যয়ের পর দেওয়া সতর্কবার্তাও উপেক্ষিত। উন্নয়নের দৌড়ে পাহাড়কে কংক্রিটে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, আর প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন একটাই— কোথায় থামবে এই অন্ধ উন্নয়ন? প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, তার সঙ্গে সহাবস্থানই একমাত্র সমাধান। মানুষকেই এবার প্রকৃতির সীমারেখা সম্মান করতে হবে, না হলে বিপর্যয়ের এই রক্তচক্র থেকে মুক্তি নেই।
চিনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে দৃঢ় সংকল্প ভারত, এসসিও শীর্ষবৈঠকে নতুন কূটনৈতিক দিশা খুঁজছেন মোদী