প্লেজ়ার ম্যারেজ
ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে সম্প্রতি একটি বিতর্কিত প্রথা বেড়ে উঠেছে, যার নাম ‘প্লেজ়ার ম্যারেজ’। এই প্রথা মূলত পর্যটকদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে অস্থায়ী বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে স্থানীয় যুবতীদের আয় রোজগার নিশ্চিত করছে। বিয়ের মেয়াদ পাঁচ থেকে সাত দিন মাত্র, যার পরেই সেই বিবাহ বন্ধন ভেঙে যায়। তবে এর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনে বেশ বড়ো রকমের প্রভাব পড়েছে।
কী এই ‘প্লেজ়ার ম্যারেজ’?
‘প্লেজ়ার ম্যারেজ’ হল একটি স্বল্পমেয়াদি বিবাহ ব্যবস্থা, যেখানে ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের তরুণীরা মূলত পর্যটকদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে অস্থায়ী বিবাহে আবদ্ধ হন। একাধিক সংবাদমাধ্যম এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় এনেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে, প্রধানত পশ্চিম এশিয়ার পর্যটকরা এই বিবাহ প্রথায় আগ্রহী। পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার পুনকা অঞ্চল বিশেষ করে এই ধরনের পর্যটকদের আকর্ষণ করছে, কারণ এখানে পর্যটক এবং স্থানীয় যুবতীদের মধ্যে সহজেই যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব।
বিয়ের প্রথা এবং এর আর্থিক লেনদেন
এই অস্থায়ী বিবাহ প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ এবং দ্রুত সম্পন্ন করা হয়। উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ের আয়োজন করা হয়, যা অত্যন্ত অনাড়ম্বর এবং ছোট আকারে হয়। বিনিময়ে ওই পর্যটক যুবতী নববধূকে মোটা টাকা প্রদান করেন। পাঁচ-সাত দিন পরে সেই পর্যটক দেশে ফিরে যান, এবং এই অস্থায়ী বিবাহ সম্পর্কও সেখানেই শেষ হয়ে যায়। জানা গিয়েছে, এই অল্পদিনের বিবাহ থেকে প্রত্যেক যুবতী ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন।
কেন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এই প্রথা?
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক মন্দার কারণেই এই প্রথা এত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দরিদ্র পরিবারে জন্মানো তরুণীরা নিজেদের জীবনযাত্রা এবং পরিবারের খরচ সামলাতে বাধ্য হয়ে এই অস্থায়ী বিবাহকে পেশা হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাব এবং পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক বিকল্প না থাকায় যুবতীরা এই প্রথায় জড়িয়ে পড়ছেন।
গ্রামাঞ্চলের তরুণীরা পর্যটকদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাদের কাছ থেকে যে অর্থ পেয়ে থাকেন, তা দিয়ে তাঁদের নিজেদের জীবনধারা বজায় রাখা সহজ হচ্ছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কিত প্রথাটি স্থানীয় পর্যটনকেও সমৃদ্ধ করছে বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এই অস্থায়ী বিবাহের প্রচলন রীতিমতো লাভজনক।
এই প্রথার আইনি অবস্থা
ইন্দোনেশিয়ার আইন অনুযায়ী এই প্রথা বেআইনি। তবুও বেশ কিছু গ্রামে এই ধরনের অস্থায়ী বিবাহের প্রচলন রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে স্থানীয় মানুষরা আইন অমান্য করেই এই বিবাহ প্রথাকে গ্রহণ করছে। প্রাথমিকভাবে পরিবারের সদস্য বা পরিচিতরাই এই অস্থায়ী বিবাহের ব্যবস্থা করতেন। তবে সম্প্রতি এই প্রথাটি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, অনেক সংস্থা এই বিবাহের ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত হয়েছে এবং প্রথাটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
তরুণীদের অভিজ্ঞতা
সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কিছু ইন্দোনেশীয় তরুণী তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। একজন জানিয়েছেন, তিনি ১৫টিরও বেশি বার এই অস্থায়ী বিবাহে আবদ্ধ হয়েছেন। তাঁর প্রথম স্বামী ছিলেন সৌদি আরবের এক পর্যটক, যিনি ৫০ বছর বয়সি। প্রথম বিয়েতে তিনি প্রায় ৭১ হাজার টাকা পান, যার মধ্যে অর্ধেক টাকা দিতে হয় মধ্যস্থতাকারী সংস্থাকে। আর এক তরুণী জানিয়েছেন, তিনি প্রায় ২০টি অস্থায়ী বিয়ের পর এই প্রথা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং বর্তমানে এক ইন্দোনেশীয়কে বিয়ে করে দুই সন্তান নিয়ে সংসার করছেন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ
ইন্দোনেশিয়ার সমাজে এই প্রথা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সমাজবিদরা বলছেন, এই ধরনের অস্থায়ী বিবাহ সামাজিক ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আর্থিক সংকটের মুখে পড়া ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে এটি একটি সহজলভ্য উপার্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিতর্কিত হলেও এই প্রথা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে অনেকে মনে করছেন।
এই ‘প্লেজ়ার ম্যারেজ’ প্রথা ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে এক নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছল্য অর্জনের এই পন্থা নৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।