ইজ়রায়েলি হামলায় সানার বিমানবন্দর রক্তাক্ত
ইয়েমেনের রাজধানী সানার আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হলো। ইজ়রায়েলি যুদ্ধবিমান হঠাৎই সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়, ছোড়ে একাধিক এয়ার-টু-সারফেস মিসাইল। বৃহস্পতিবার এই ভয়াবহ হামলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস কোনও মতে প্রাণে বেঁচে যান। তবে, হতাহতের ঘটনা বিমানবন্দর চত্বরকে আরও শোকাবহ করে তুলেছে।
ইজ়রায়েলি হামলা এবং তার পটভূমি
ইজ়রায়েলি বিমানহানার পেছনে রয়েছে গত সপ্তাহে হুথি বিদ্রোহীদের চালানো হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া। হুথি বাহিনী ‘প্যালেস্টাইন-২’ নামে একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ইজ়রায়েলের দিকে নিক্ষেপ করেছিল। এই ক্ষেপণাস্ত্রের গতি শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। এর ফলে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দেন, ‘‘হুথিদের সমস্ত পরিকাঠামো ধ্বংস করে দিতে।’’
সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশাপাশি হোদেইদাহ বিদ্যুৎকেন্দ্রেও আছড়ে পড়ে ইজ়রায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র। হুথি পরিচালিত সংবাদমাধ্যম আল-মাসিরাহ জানায়, বিমানবন্দর হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ৩০ জন আহত হয়েছেন।
হু প্রধান টেড্রসের অলৌকিক রক্ষা
সানার বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি দলের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হু প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস। বিমানবন্দরের রানওয়েতে বিমানে ওঠার আগেই ঘটে এই হামলা। টেড্রস নিজে জানিয়েছেন, ‘‘আমাদের বিমানবন্দর বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছিল। আমি ভাগ্যবান যে প্রাণে বেঁচে গেছি।’’ এই ঘটনার পর টেড্রস ও তাঁর সঙ্গীরা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে যান।
ইজ়রায়েলের সামরিক অভিযান
হুথিদের লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিশেষত লোহিত সাগরগামী বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা, ইজ়রায়েল ও তার মিত্রদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে হুথিদের এই আক্রমণ ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে আরও বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘‘আমরা হুথিদের ক্ষমতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে দিতে প্রস্তুত।’’ ইজ়রায়েলের এই সামরিক অভিযানে সমর্থন জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংকট
ইয়েমেনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে অস্থির। সৌদি আরবের সমর্থিত ইয়েমেনের সুন্নি মুসলিম সরকার এবং ইরানের মদতপুষ্ট শিয়া গোষ্ঠী হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। যদিও রাজধানী সানার অনেক অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়ে গেছে।
হুথি বাহিনী ইরানের পাশাপাশি লেবাননের শিয়া গোষ্ঠী হিজ়বুল্লাহর কাছ থেকেও অস্ত্রসাহায্য পায়। এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন সেনাদের নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা
ইজ়রায়েলের এই সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের উপর আক্রমণ শুধু ইয়েমেন নয়, সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা বাড়াতে পারে। হুথিদের সমর্থনে ইরান সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নামলে এই সংঘাত আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
শেষ কথা
ইয়েমেনের মাটিতে ইজ়রায়েলি হামলা শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের অলৌকিক রক্ষা হয়তো এই আক্রমণের ভয়াবহতাকে কিছুটা লঘু করেছে, কিন্তু ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দুর্দশা আরও গভীর হলো। এই সংঘাত সমাধানের পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি।