আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু তকমা
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কে সংখ্যালঘু তকমা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চে কিছুদিন আগে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা হয়। এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারল না প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ, যাদের মধ্যে কিছু বিচারপতি এই তকমা ফেরানোর পক্ষে মত দেন, আবার অন্যরা এর বিরোধিতা করেন।
১৯৮১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধন করে একে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের তকমা দেওয়া হয়েছিল, যার ফলে সেখানে সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল। তবে, ২০০৬ সালে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট ওই আইন খারিজ করে দেয়। এরপর থেকে বিষয়টি আদালতে নানা পর্যায়ে বিচারাধীন রয়েছে।
এবার, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে সাত সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ এ বিষয়ে শুনানি করে। এই বেঞ্চের চার সদস্য—প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড়, বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা, বিচারপতি সঞ্জীব খন্না, এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্র—ইলাহাবাদ হাইকোর্টের আগের রায় খারিজ করেছেন। তবে, এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে একটি নতুন বেঞ্চ, এমনটাই জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।
ইতিহাসের পটভূমি:
১৯৬৭ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু তকমা খারিজ করেছিল ভারতের শীর্ষ আদালত। তারপর ১৯৮১ সালে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে আইন সংশোধন করে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এতে করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণ চালু করা হয়। তবে, ২০০৬ সালে ইলাহাবাদ হাইকোর্ট সেই আইন খারিজ করে দেয়, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।
সাম্প্রতিক রায় ও রাজনীতির প্রভাব:
এই মামলার প্রধান প্রসঙ্গ ছিল, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কে সংখ্যালঘু তকমা দেওয়া সংবিধানিকভাবে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রায় দেন যে, এই তকমা ফেরার পথ উন্মুক্ত হতে পারে, তবে এর জন্য আরও গভীর বিচার প্রয়োজন। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র রায় দেন বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র। তারা এই তকমা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন এবং বলেছেন যে, এতে দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির পরিপন্থী হতে পারে।
সংখ্যালঘু তকমার সুবিধা ও বিরোধিতা:
যদি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংখ্যালঘু তকমা পায়, তবে সেই প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে, এই সংরক্ষণ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। তবে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তরপ্রদেশ সরকারের সংরক্ষণ নীতি মেনে চলে না, এবং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষত মোদী সরকারের অবস্থান ছিল আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তকমা দেওয়ার বিরুদ্ধে। সরকারের যুক্তি ছিল, কোনও প্রতিষ্ঠান যদি ধর্মের ভিত্তিতে বিশেষ তকমা পায়, তবে তা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বিরুদ্ধে যায়। তারা দাবি করে, সংসদে আইন পাস করে যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে পরবর্তীতে ধর্মের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু তকমা দেওয়া অসাংবিধানিক।
এছাড়া, সংখ্যালঘু তকমা থাকলে ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত হয় সংখ্যালঘুদের জন্য, কিন্তু এতে তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হয়, কারণ ওই শ্রেণির জন্য সংরক্ষণ নেই। এতে জাতপাতের ভিত্তিতে সংরক্ষণ পদ্ধতির ওপরও প্রশ্ন ওঠে।
কেন্দ্রের অবস্থান:
কেন্দ্রের আইনজীবী, সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা এই বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘‘১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতার পূর্ব যুগেও একটি জাতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। তাই, এটি শুধু সংখ্যালঘুদের জন্য হতে পারে না।’’ তাঁর এই বক্তব্য, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও জাতীয় স্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে, বিষয়টিকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভাবনা দিয়ে দেখতে উত্সাহিত করে।
উপসংহার:
আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু তকমা দেওয়ার বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ যেখানে এই তকমা ফেরানোর পথে একটি সম্ভাবনা তৈরি করেছে, সেখানে বিরোধী বিচারপতিরা এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। এই রায়টি শুধুমাত্র আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়, বরং ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে। শীঘ্রই একটি নতুন বেঞ্চ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে এ বিষয়ে পথপ্রদর্শন করবে।