AI ট্রেন্ডের পরিবেশমূল্য কতটা
সমাজমাধ্যমে এখন যেন ফিরে এসেছে আশির দশক। বড় চুল, প্যাস্টেল রং, ডেনিম, নাটকীয় স্টুডিয়ো আলো—চ্যাটজিপিটি, জেমিনাইয়ের মতো এআই টুলে নিজের ছবি ‘রেট্রো’ সাজিয়ে নেওয়ার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোনের পর্দায় তৈরি হয়ে যাচ্ছে এমন ছবি, যা দেখে মনে হতে পারে পুরনো কোনও পারিবারিক অ্যালবাম থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু এই সামান্য কয়েক সেকেন্ডের নেপথ্যে যে বিপুল পরিকাঠামো কাজ করছে, তার পরিবেশগত খরচ নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
একটি এআই ছবি তৈরি করতে প্রয়োজন শক্তিশালী কম্পিউটিং ক্ষমতা। সেই কাজ হয় ডেটা সেন্টারে থাকা সার্ভার ও জিপিইউতে। এগুলি চালাতে বিদ্যুৎ লাগে, আর বিপুল কম্পিউটিংয়ের ফলে তৈরি হয় তাপ। সেই তাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আবার প্রয়োজন কুলিং ব্যবস্থা। অনেক ডেটা সেন্টারে সেই শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় জলও ব্যবহৃত হয়।
একটি ছবির ক্ষেত্রে এই ব্যবহার হয়তো খুব বেশি বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষ একই ধরনের ছবি তৈরি করেন, একাধিক সংস্করণ পরীক্ষা করেন এবং ভাইরাল ট্রেন্ডে বার বার নতুন ছবি বানান, তখন সামগ্রিক হিসাবটি বদলে যায়। কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি ও হাগিং ফেসের গবেষণায় এআই ছবি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ সিস্টেম ও কাজের ধরন অনুযায়ী ঘণ্টায় প্রায় ০.০১ থেকে ০.২৯ কিলোওয়াট পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল।
পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি শুধু বিদ্যুৎ খরচেই শেষ নয়। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখতে জল প্রয়োজন হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের একটি গবেষণায় GPT-3 প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ মিঠা জলের প্রয়োজনের কথা উঠে এসেছিল। গবেষকদের একটি হিসাব অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটির সঙ্গে ২০ থেকে ৫০টি প্রশ্নোত্তরের একটি সিরিজের জন্য প্রায় ৫০০ মিলিলিটার জল ব্যবহৃত হতে পারে। তবে এই হিসাব নির্দিষ্ট নয়—স্থান, কুলিং প্রযুক্তি, বিদ্যুতের উৎস এবং কাজের চাপের মতো একাধিক বিষয়ের উপর তা নির্ভর করে।
এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হার্ডওয়্যার তৈরির পরিবেশগত মূল্যও। এআই পরিকাঠামোর জন্য প্রয়োজন জিপিইউ, সার্ভার, নেটওয়ার্কিং যন্ত্র এবং সেমিকন্ডাক্টর। এগুলি তৈরিতে খনিজ উত্তোলন, জ্বালানি, জল এবং দীর্ঘ সাপ্লাই চেনের প্রয়োজন হয়। পরে সেই যন্ত্র বাতিল হলে তৈরি হয় ইলেকট্রনিক বর্জ্য। ফলে একটি এআই ছবি তৈরির পরিবেশগত প্রভাব হিসাব করতে গেলে শুধু সেই ছবি তৈরির সময়ের বিদ্যুৎ খরচ দেখলেই পুরো ছবিটা পাওয়া যায় না।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ডেটা সেন্টারগুলির বিদ্যুৎ ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভাবে বাড়তে পারে। অর্থাৎ আজকের ছোটখাটো ভাইরাল ট্রেন্ডের পাশাপাশি এআই পরিষেবার সামগ্রিক ব্যবহার বাড়লে ডেটা সেন্টারের উপর চাপও বাড়বে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে একটি রেট্রো ছবি তৈরি করলেই পরিবেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। বরং উদ্বেগের জায়গাটি হল বিপুল সংখ্যক মানুষের সম্মিলিত ব্যবহার। একটি ছবি, তার পাঁচটি সংস্করণ, আবার নতুন প্রম্পটে আরও কয়েকটি ছবি—ব্যক্তিগত ভাবে ছোট মনে হলেও কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে এই কাজের মোট কম্পিউটিং চাহিদা অনেক বড় হতে পারে।
এই প্রশ্নের বাস্তব দিকটি ভারতের ক্ষেত্রেও সামনে এসেছে। অগস্টে রয়টার্সের প্রতিবেদনে অন্ধ্রপ্রদেশে গুগ্লের পরিকল্পিত বৃহৎ ডেটা সেন্টার প্রকল্প ঘিরে জলসম্পদ ও বন্যপ্রাণ নিয়ে পরিবেশকর্মীদের উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, প্রকল্পটি স্থানীয় জলসম্পদের উপর চাপ ফেলতে পারে। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার অবশ্য প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আশির দশকের এই এআই ট্রেন্ড হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই সমাজমাধ্যম থেকে হারিয়ে যাবে। তার জায়গা নেবে অন্য কোনও নতুন ট্রেন্ড। কিন্তু ছবি তৈরির নেপথ্যে থাকা ডেটা সেন্টার, সার্ভার ও পরিকাঠামো থেকে যাবে। তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কত দ্রুত ছবি তৈরি হচ্ছে’ তা নয়—সেই গতির জন্য বিদ্যুৎ, জল এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কতটা প্রয়োজন হচ্ছে, সেটিও ভাবার বিষয়।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।