আপনি কি ভারতীয় নাগরিক?
পাসপোর্ট থাকলেই কি একজন ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন? সম্প্রতি বিদেশ মন্ত্রকের একটি মন্তব্য ঘিরে এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। মন্ত্রকের বক্তব্য, পাসপোর্ট মূলত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের নথি, এটি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এরপর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল বেড়েছে— তাহলে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে কোন নথি প্রয়োজন? আবার নাগরিকত্ব (Citizenship) ও জাতিসত্তা বা জাতীয় পরিচয় (Nationality)-র মধ্যে পার্থক্যই বা কী?
কেন বিতর্ক?
২৪ জুন পাসপোর্ট সেবা দিবসের অনুষ্ঠানে বিদেশ মন্ত্রকের এক আধিকারিক জানান, পাসপোর্টের প্রধান উদ্দেশ্য বিদেশে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া। এটি নাগরিকত্বের একমাত্র বা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক শুরু হয়।
অনেকের প্রশ্ন, পাসপোর্ট পাওয়ার আগে তো পুলিশ যাচাই-সহ একাধিক ধাপের পরীক্ষা হয়। তাহলে সেটিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ বলা যাবে না কেন?
সরকারের ব্যাখ্যা
বিদেশ মন্ত্রক জানায়, ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনের ২০ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে জনস্বার্থে ভারতীয় নাগরিক নন এমন ব্যক্তিকেও পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ আইনের দৃষ্টিতে পাসপোর্ট পাওয়া মানেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়া নয়।
কীভাবে নির্ধারিত হয় ভারতীয় নাগরিকত্ব?
ভারতে নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয় ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী। এই আইনে কয়েকটি উপায়ে ভারতীয় নাগরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে—
- জন্মসূত্রে
- উত্তরাধিকার বা বংশসূত্রে
- নিবন্ধনের মাধ্যমে
- স্বাভাবিকীকরণ (Naturalisation)-এর মাধ্যমে
- নতুন কোনও অঞ্চল ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়ম
ভারতে জন্মের সময়ের উপর ভিত্তি করে নিয়ম আলাদা।
- ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ থেকে ১ জুলাই ১৯৮৭-এর মধ্যে জন্ম হলে, জন্মস্থান ভারত হলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যায়।
- ১ জুলাই ১৯৮৭ থেকে ৩ ডিসেম্বর ২০০৪-এর মধ্যে জন্ম হলে, বাবা বা মায়ের অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক হতে হবে।
- ৩ ডিসেম্বর ২০০৪-এর পরে জন্ম হলে, বাবা বা মায়ের একজন ভারতীয় নাগরিক হওয়া ছাড়াও অন্যজন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হতে পারবেন না।
বিদেশে জন্মালে কী হবে?
ভারতের বাইরে জন্ম নেওয়া সন্তানও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে বংশসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারেন। এছাড়া ভারতীয় নাগরিকের স্বামী বা স্ত্রী, ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি কিংবা দীর্ঘদিন ভারতে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন।
নাগরিকত্ব প্রমাণে কোন নথি গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতে জন্মসূত্রে নাগরিকদের জন্য আলাদা কোনও “সিটিজেনশিপ সার্টিফিকেট” থাকে না। তবে প্রয়োজন হলে নিচের নথিগুলি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—
- জন্মের শংসাপত্র
- বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- নাগরিকত্ব সনদ (যদি নিবন্ধন বা Naturalisation-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়া হয়ে থাকে)
- সরকারের জারি করা সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের নথি
প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোন নথি প্রয়োজন হবে, তা ব্যক্তির নাগরিকত্ব অর্জনের পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।
আধার, ভোটার কার্ড বা পাসপোর্ট কি যথেষ্ট?
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী—
- আধার কার্ড পরিচয় ও বাসস্থানের প্রমাণ।
- ভোটার পরিচয়পত্র ভোটদানের অধিকার প্রমাণ করে।
- ড্রাইভিং লাইসেন্স গাড়ি চালানোর অনুমতি দেয়।
- পাসপোর্ট আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সরকারি নথি।
এই নথিগুলির কোনওটিকেই আইনগতভাবে সব পরিস্থিতিতে নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় না।
ওসিআই (OCI) কার্ডধারীদের ক্ষেত্রে
OCI বা Overseas Citizen of India কার্ডধারীরা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও তাঁরা ভারতের পূর্ণ নাগরিক নন। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে তাঁরা পরে ভারতীয় নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ভারত এখনও দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দেয় না।
নাগরিকত্ব ও জাতিসত্তার পার্থক্য
এই দুই শব্দকে অনেকেই এক মনে করলেও আইনি অর্থে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
নাগরিকত্ব (Citizenship) হল একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির আইনি সম্পর্ক। এটি আইন অনুযায়ী অর্জন করা যায়, পরিবর্তনও করা যায়।
অন্যদিকে জাতিসত্তা বা Nationality ব্যক্তির জন্ম, বংশপরিচয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর ধারণা। এটি আইনি নাগরিকত্বের মতো সহজে পরিবর্তিত হয় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনও ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি পরে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেও তাঁর জাতিগত বা সাংস্কৃতিক পরিচয় ভারতীয় হিসেবেই থেকে যেতে পারে। আবার বিশ্বের কিছু দেশে দ্বৈত নাগরিকত্বের ব্যবস্থা থাকলেও ভারতে বর্তমানে সেই সুযোগ নেই।
কী মনে রাখা জরুরি?
পাসপোর্ট, আধার বা ভোটার কার্ড গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি হলেও সব আইনি পরিস্থিতিতে এগুলিকে নাগরিকত্বের একমাত্র বা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয় না। নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্ম, বংশপরিচয়, নাগরিকত্ব অর্জনের পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় সরকারি নথি— সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। তাই কোনও একক নথির উপর নির্ভর না করে প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্র সংরক্ষণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?