অপমানের জবাব ‘স্বর্গীয় প্রাসাদে’!!
আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণার মঞ্চে এক সময় প্রায় একঘরে হয়ে গিয়েছিল চিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)-এর অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়নি বেজিং। কিন্তু সেই প্রত্যাখ্যানই যেন চিনের মহাকাশ কর্মসূচিকে আরও জোরালো করে তোলে। নিজেদের প্রযুক্তি ও বিপুল বিনিয়োগের জোরে পৃথিবীর কক্ষপথে তৈরি করে ফেলেছে নিজস্ব মহাকাশ গবেষণাকেন্দ্র— তিয়াংগং স্পেস স্টেশন, যার অর্থ ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’।
এক সময়ে মহাকাশ গবেষণায় আধিপত্য ছিল United States ও Russia-র। ১৯৮০-এর দশকে পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্থায়ী গবেষণাগার তৈরির পরিকল্পনা নেয় আমেরিকা। পরে সেই প্রকল্পে রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান ও কানাডার মতো দেশ যোগ দেয়। এ ভাবেই তৈরি হয় International Space Station। কিন্তু চিনকে সেই প্রকল্পের বাইরে রাখা হয়।
এর পিছনে ছিল রাজনৈতিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং মহাকাশ প্রযুক্তি ভাগাভাগি নিয়ে আপত্তি। বিশেষ করে ২০১১ সালের মার্কিন আইনের পরে NASA-র সঙ্গে চিনের সরাসরি সহযোগিতার পথ আরও কঠিন হয়ে যায়।
তবে পিছিয়ে যায়নি বেজিং। ১৯৭০ সালে প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পর থেকেই ধাপে ধাপে নিজেদের মহাকাশ প্রযুক্তি গড়ে তুলতে থাকে চিন। উপগ্রহ, রকেট, মানব মহাকাশ অভিযান— প্রতিটি ক্ষেত্রে অগ্রগতির পর ২০২২ সালের অক্টোবরে সম্পূর্ণ রূপ পায় তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশন।
পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে নিম্ন কক্ষপথে থাকা এই স্টেশনটির আকৃতি অনেকটা ইংরেজি ‘টি’-এর মতো। এতে রয়েছে তিনটি প্রধান মডিউল—
- তিয়ানহে — মূল নিয়ন্ত্রণ ও মহাকাশচারীদের থাকার জায়গা
- ওয়েনতিয়ান — জীববিজ্ঞান ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার গবেষণাগার
- মেংতিয়ান — পদার্থবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত গবেষণার ল্যাবরেটরি
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের তুলনায় তিয়াংগং আকারে ছোট হলেও চিনের কাছে এর গুরুত্ব বিশাল। এখানে মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি-কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে নানা পরীক্ষা চালানো হয়। মানবদেহে মহাকাশের প্রভাব, উদ্ভিদ চাষ, নতুন পদার্থ তৈরি এবং ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতি— সবই এই গবেষণার অংশ।
তিয়াংগংয়ে নিয়মিত তিন জন করে চিনা মহাকাশচারী বা ‘তাইকোনট’ অবস্থান করেন। তাঁরা দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযানের জন্য প্রশিক্ষণ নেন।
চিন শুধু বর্তমান গবেষণাতেই থেমে নেই। ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনার অংশ হিসাবেও তিয়াংগংকে ব্যবহার করতে চাইছে তারা। চাঁদের মাটি ব্যবহার করে তৈরি ইট, মহাকাশের বিকিরণে তার পরিবর্তন— এমন নানা পরীক্ষাও চালানো হচ্ছে।
তবে তিয়াংগং নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। চিনের মহাকাশ কর্মসূচি মূলত রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় গবেষণার সব তথ্য প্রকাশ্যে আসে না। ফলে আমেরিকা-সহ বহু দেশ এই প্রকল্পকে কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
অন্য দিকে, International Space Station ২০৩০ সালের দিকে অবসর নেওয়ার পথে। সেই জায়গায় ভবিষ্যতে ছোট বেসরকারি মহাকাশ স্টেশনের পাশাপাশি তিয়াংগং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিনের মহাকাশযাত্রার গল্প আসলে দীর্ঘ কয়েক দশকের পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সংকল্পের ফল। এক সময় যে দেশকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, সেই দেশই এখন নিজস্ব ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’ নিয়ে মহাকাশে শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেছে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?