মমতাকে আক্রমণ, বাম-কংগ্রেসকে বার্তা হুমায়ুন কবীরের!
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক হুমায়ুন কবীর পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২২ ডিসেম্বর, সোমবার দুপুরে তাঁর নতুন রাজনৈতিক দলের নাম ঘোষণা করতে চলেছেন। মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় চলছে শেষ মুহূর্তের তোড়জোড়। মঞ্চ নির্মাণ থেকে নিরাপত্তা, ভিড় সামলানো— সব দিকেই তৎপর উদ্যোক্তারা। দল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে নিজের রাজনৈতিক রূপরেখা ও লক্ষ্য নিয়ে মুখ খুললেন হুমায়ুন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে যেমন রাজ্যের রাজনীতিতে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ হয়েছিল, ঠিক তেমনই আর একটি নির্বাচনের মুখে নতুন দলের জন্ম হতে চলেছে। হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, এই লড়াই মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিজেপির বিরুদ্ধে। তাঁর কথায়, “মমতা ও বিজেপিবিরোধী সকল শক্তিকে এক ছাতার তলায় আনতে চাই। আসন সমঝোতার মাধ্যমে লড়াই করাই লক্ষ্য। কিন্তু কেউ যদি অহংকার দেখান, তা হলে একাই লড়ব। প্রয়োজনে রাজ্যের সব আসনে প্রার্থী দেব।”
মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা ঘিরে বিতর্কের জেরে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব চরমে ওঠে। দল তাঁকে সাসপেন্ড করার পর থেকেই নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ার কথা বলে আসছিলেন তিনি। বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফার কথাও বলেছিলেন এক সময়, যদিও শেষ পর্যন্ত ‘মানুষের স্বার্থে’ সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। সমালোচকেরা বলছেন, হুমায়ুন অনেক কথাই বলেন আবেগে। তবে একটি বিষয়ে তিনি অনড়— নিজের দল গড়ার প্রশ্নে।
সোমবার দুপুর ১টায় বেলডাঙার খাগরুপাড়া মোড়ে প্রায় ৪৯ বিঘা জমির উপর বিশাল জমায়েতের মধ্য দিয়ে দলের নাম ও রাজ্য কমিটি ঘোষণা করবেন হুমায়ুন। যদিও মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতির নাম ওই দিন ঘোষণা করা হচ্ছে না। শেষ মুহূর্তে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত বদল হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে রাজ্যের ৩৪১টি ব্লক ও ১২৫টি পুর এলাকায় সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির কথা ঘোষণা করবেন। প্রথম ঘোষণাতেই পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সভাপতির নাম জানানো হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
হুমায়ুনের দাবি, ৬ ডিসেম্বরের জনসমাবেশই ছিল শাসক দলের পতনের সূচনা। এ বার তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরাতে কংগ্রেস, বাম ও আইএসএফকে একসঙ্গে লড়াইয়ের ডাক দিলেন তিনি। যদিও প্রকাশ্য সভাগুলিতে তিনি বারবার বলেছেন, সংখ্যালঘু ভোট একত্রিত করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। অন্তত ৯০টি আসনে জিতে সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চান তিনি।
দল ঘোষণার দিন হিসেবে সোমবার বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে ব্যক্তিগত বিশ্বাস। হুমায়ুনের কথায়, “আমার জন্ম সোমবার ভোরে। মা এখনও বেঁচে আছেন, তাঁর বয়স ১০০ ছুঁইছুঁই। তিনি চান, সোমবার আমি ভালো কিছু করি। মানুষের জন্য দল গড়ছি, তাই এই দিনটাই সেরা।” সোমবারের সঙ্গে শিবের যোগ টেনে তিনি বলেন, “শিবঠাকুরের মতোই আমি একগুঁয়ে। যা বলি, করে ছাড়ি।”
ইতিমধ্যে বেলডাঙা জুড়ে পোস্টারে ছয়লাপ, যদিও কোথাও দলের নাম বা প্রতীক প্রকাশ করা হয়নি। হুমায়ুনের দাবি, দলের নাম ও প্রতীক জানতেই লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিড় করবেন। প্রতীক হিসেবে তাঁর প্রথম পছন্দ ‘টেবিল’, নির্দল প্রার্থী হিসেবে যা দিয়ে তিনি একসময় জিতেছিলেন। দ্বিতীয় পছন্দ ‘জোড়া গোলাপ’।
সভাস্থলে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু মঞ্চ, অত্যাধুনিক প্যান্ডেল, বিশাল এলইডি স্ক্রিন ও ড্রোন নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা পুলিশ ও প্রায় দু’হাজার স্বেচ্ছাসেবক ট্রাফিক ও নিরাপত্তা সামলাবেন। খাবার, জল, অ্যাম্বুল্যান্স ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও থাকছে।
সব মিলিয়ে, হুমায়ুন কবীরের নতুন রাজনৈতিক অভিযানের ঘোষণা শুধু একটি দলের আত্মপ্রকাশ নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন চাপানউতরের সূচনা বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।