যুবভারতী কাণ্ডে রাজনীতির গতি ঘুরিয়ে দিলেন মমতা
যুবভারতীতে মেসির অনুষ্ঠান ঘিরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে বিজেপি। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট— প্রতিবাদের ঝড় তুলে রাজ্য সরকারকে কোণঠাসা করা। কিন্তু সেই পরিকল্পনায় খুব দ্রুতই জল ঢেলে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনার চার দিনের মধ্যেই একের পর এক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি এমন এক বার্তা দেন, যাতে বিরোধীদের আক্রমণের ধার অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যায় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ঘটনার পর প্রথমেই মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। রাজ্য সরকার বা তৃণমূল অনুষ্ঠানটির আয়োজক না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এই পদক্ষেপ অনেকের চোখে ব্যতিক্রমী ও রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানেই থামেননি তিনি। প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন, ক্রীড়া দফতরের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের দফতর থেকে অব্যাহতি নেওয়ার প্রস্তাবে সম্মতি, রাজ্য পুলিশের ডিজি ও বিধাননগরের পুলিশ কমিশনারকে শোকজ়, এক ডেপুটি কমিশনারকে সাসপেন্ড করা, ক্রীড়াসচিব ও যুবভারতীর সিইও-র বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা— খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশাসনিক স্তরে একের পর এক সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন মুখ্যমন্ত্রী। সব শেষে অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসারদের নিয়ে বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করে দেন।
তৃণমূলের দাবি, এই দ্রুত পদক্ষেপগুলির ফলে বিজেপির হাতে নতুন করে তোপ দাগার মতো খুব বেশি কিছু আর রইল না। তবু প্রতিবাদের আবহ বজায় রাখতে বুধবার নিজেই যুবভারতী চত্বরে পৌঁছে যান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিজেপির একাধিক বিধায়ক। মাঠে ঢুকতে না পারলেও তাঁরা বিক্ষোভ দেখান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের গ্রেফতারের দাবি তোলেন। পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধেও তীব্র ভাষায় আক্রমণ শোনা যায়।
কিন্তু ততক্ষণে রাজনৈতিক ছবিটা বদলে গিয়েছে। বিজেপি শুরু থেকেই যে সব দাবি তুলছিল— তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, দায়িত্ব নির্ধারণ— তার প্রায় সবই ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী করে ফেলেছেন। শুধু কয়েক জন মন্ত্রীর গ্রেফতারির দাবি বাদ রয়েছে। বিজেপির অন্দরেই অনেকের মতে, এই দাবি বাস্তবের চেয়ে রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রেফতারের মতো অপরাধ আদৌ হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ফলে বিরোধীদের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তগুলিকে ‘লোকদেখানো’ বলা ছাড়া খুব বেশি বিকল্প থাকছে না।
এর মধ্যেই শোকজ় করা তিন পুলিশ আধিকারিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের জবাব জমা দিয়েছেন। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যে থমকে নেই, বরং দ্রুত এগোচ্ছে— এই বার্তাই স্পষ্ট ভাবে দিতে চেয়েছে রাজ্য সরকার।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মমতার রাজনীতি কাছ থেকে দেখা শুভেন্দুও বুঝেছেন যে যুবভারতীর বিশৃঙ্খলার ঘটনার চেয়েও এখন আলোচনার কেন্দ্রে মুখ্যমন্ত্রীর তৎপর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। তাই হয়তো নিজেই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের ছবি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতে নতুন কোনও ঢেউ ওঠেনি।
তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের কথায়, “একটা খারাপ ঘটনা ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী নিন্দা করেছেন, দল নিন্দা করেছে। তার পর প্রশাসনিক পদক্ষেপও হয়েছে। এর পর বিজেপির আর নতুন করে বলার কিছু নেই।”
একই সুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়েছেন, কয়েক জনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং আয়োজক থেকে প্রশাসন— সকলকেই জবাবদিহি করতে হবে।
সব মিলিয়ে যুবভারতী কাণ্ডকে হাতিয়ার করে যে রাজনৈতিক ঝড় তুলতে চেয়েছিল পদ্ম শিবির, মুখ্যমন্ত্রীর দ্রুত ও আক্রমণাত্মক প্রশাসনিক পদক্ষেপে সেই ঝড় আপাতত অনেকটাই স্তিমিত— এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।