তিন ঘণ্টার ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ করে যিনি গড়লেন গেমিং সাম্রাজ্য!
“আর তিন ঘণ্টার বেশি বাঁচবেন না”—চিকিৎসকদের সেই নির্মম রায় শুনেই যেন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। মাত্র ১৮ বছরের এক তরুণ, কলেজে পড়ার প্রথম সেমেস্টার, সামনে গোটা জীবন পড়ে থাকার কথা। অথচ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ঝেংহুয়া ইয়াংয়ের কাছে তখন সময় বলতে হাতে গোনা কয়েকটি ঘণ্টা। পরিবারকে কার্যত প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল চরম পরিণতির জন্য।
২০০৮ সাল। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইয়াং হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলে বিষয়টিকে প্রথমে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু দ্রুতই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পরীক্ষার পর ধরা পড়ে, তিনি আক্রান্ত ইডিয়োপ্যাথিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপুরা নামের এক বিরল অটোইমিউন রোগে। শরীরে প্লেটলেটের মাত্রা এতটাই কমে গিয়েছিল যে সামান্য আঘাতও প্রাণঘাতী হতে পারত। চিকিৎসকেরা তখন আশঙ্কা করেছিলেন, তাঁর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
কিন্তু সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়নি।
পরবর্তী দু’বছর হাসপাতালের শয্যাই হয়ে ওঠে ইয়াংয়ের পৃথিবী। শারীরিক দুর্বলতা, অনিশ্চয়তা আর একটানা চিকিৎসার মধ্যে দিন কাটত তাঁর। এই সময়েই অপ্রত্যাশিত ভাবে তাঁর জীবনে ঢুকে পড়ে ভিডিও গেম। লিগ অফ লেজেন্ডস, মাইনক্রাফ্ট, ওয়ার্ল্ড অফ ওয়ারক্রাফ্ট—এই ভার্চুয়াল জগতই হয়ে ওঠে তাঁর মানসিক আশ্রয়। অসুস্থ শরীরের মধ্যে আটকে থেকেও গেমের মাধ্যমে তিনি নতুন এক স্বাধীনতা খুঁজে পান।
ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ইয়াং ফিরে যান পড়াশোনায়। ইলিনয় থেকে পাড়ি দেন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়, বোল্ডারে। বিষয়—বিজ়নেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। কিন্তু ক্লাসের ফাঁকেও তাঁর মাথার ভিতর ঘুরপাক খেত গেমিংয়ের ভাবনা। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন, গেম শুধু বিনোদন নয়—এটা কারও জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এই বিশ্বাস থেকেই মাত্র প্রায় ৯০ হাজার টাকার মতো পুঁজি নিয়ে ইয়াং শুরু করেন গেম ডেভেলপমেন্ট স্টুডিয়ো ‘সেরেনিটি ফোর্জ’। লক্ষ্য একটাই—এমন গেম বানানো, যা খেলোয়াড়কে ভাবতে শেখাবে, আবেগে ছুঁয়ে যাবে এবং মানসিক ভাবে শক্ত করবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ছোট উদ্যোগই রূপ নেয় এক সমৃদ্ধ গেমিং সাম্রাজ্যে।
আজ সেরেনিটি ফোর্জে কাজ করেন ৪০ জনের বেশি কর্মী। সংস্থাটি প্রকাশ করেছে প্রায় ৭০টি গেম ও বই। ‘লাইফলেস প্ল্যানেট’ বা ‘ডোকি ডোকি লিটারেচার ক্লাব’-এর মতো গেম কয়েক কোটি বার ডাউনলোড হয়েছে। বার্ষিক আয় মিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছলেও ইয়াংয়ের কাছে সাফল্যের মানে শুধু সংখ্যায় ধরা যায় না।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তখনই, যখন কোনও খেলোয়াড় এসে বলেন—এই গেম তাঁকে জীবনের অন্ধকার সময় থেকে বেরোতে সাহায্য করেছে। জীবনের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কাছে তাই সাফল্য মানে প্রভাব।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে ঝেংহুয়া ইয়াং শুধু বেঁচে থাকেননি—তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবন যত কঠিনই হোক, সেখান থেকেও অর্থপূর্ণ কিছু গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁর গল্প আজ অসংখ্য মানুষের কাছে আশার নাম।