শোক আর শূন্যতার ছায়া
যখনই শারদীয়ার ঢাক বাজতে শুরু করে, আমার বুকটা গুড়গুড় করে ওঠে। এই আনন্দের উৎসব আমার কাছে হয়ে উঠেছে আতঙ্কের—নিশ্চয়ই কেউ আবার বিদায় নেবে। ২০২২ সালে মা হারানোর পর থেকে দুর্গাপুজো আমার কাছে একরাশ কষ্টের সময়। সেই বছর থেকেই যেন মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে—তারপর দিদিকে হারালাম, এরপর বড়দিকে। এখন পুজোর ঢাকের শব্দ শুনলেই হৃদয় ভয়ে কাপিয়ে ওঠে।
আমার কাছে শারদীয়ার আর কোনও আকর্ষণ নেই। গত কয়েক বছর ধরে পুজো মানেই শহর ছেড়ে চলে যাওয়া। নির্জন কোনো জায়গায় বসে নিজের মতো করে সময় কাটানো, প্রিয়জনের চলে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকা স্মৃতিগুলোকে সামলানো। এখন আর নতুন জামা-কাপড় কেনার ইচ্ছে নেই—কার জন্য কিনব? খাওয়া-দাওয়াও যেন বন্ধ হয়ে গেছে। আগে ভাইবোনেরা মিলে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে যেতাম, মা আমাদের জন্য রান্না করত। মা যখন রান্না করতেন, তার শাকের ঝোল, মাংসের স্ট্যু—মুখে লেগে থাকত স্বর্গীয় স্বাদ। আমি কতবার চেষ্টা করেছি সেই স্বাদ ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু কখনও পুরোপুরি পারিনি।
এই বছরও তাই পরিকল্পনা করেছিলাম বাইরে চলে যাব। নিরালায় বসে দেবীর কাছে প্রার্থনা করব—আমায় যেন শোক সামলানোর শক্তি দেন। তবু এই পুজোয় একটু ভালো কিছু হয়েছিল। পোশাক পরিকল্পক অয়ন হোড়ের প্রস্তাবে অনেক বছর পরে পুজোর শুটিং করলাম। শুটিংয়ে পরা শাড়ি লাল বেনারসি—আমার প্রিয় রঙ। বিষয় ছিল মাতৃশক্তি, দেবী দুর্গা বাঙালির কাছে মাতৃরূপিনী। প্রতিটি নারীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই শক্তিকে তুলে ধরা শুটিংয়ে রাজি হলাম।
শুরুর পরিকল্পনা ছিল সকাল থেকে গঙ্গার ঘাটে শুটিং। শেষ পর্যন্ত ঠিক করা হলো রাতের মধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করা। রাত দেড়টায় মেকআপে বসেছিলাম, সাজ সম্পূর্ণ করে ক্যামেরার মুখোমুখি দাঁড়ালাম ভোরের আলোর সঙ্গে। শান্ত আহিরিটোলা গঙ্গার ঘাটে তখন এক অদ্ভুত শীতলতা। রূপসজ্জাশিল্পী নবীন দাস খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে ছিলেন—ওনার সঙ্গে বহু বছর কাজ করেছি, তাই আর কিছু বলা লাগলো না। শুটিং পরিচালনা ও ভাবনা: অয়ন হোড়, ছবি: সায়ন্তন দত্ত, রূপসজ্জা: নবীন দাস, শাড়ি: ইন্ডিলুম।
শুটিং শেষ করে অনেক বছর পরে সেই দিন কচুরি-জিলিপি খেয়েছিলাম। উত্তর কলকাতার কচুরি-জিলিপি বিখ্যাত, স্বাদে আলাদা। কাজ শেষে সবাই মিলে হইহই করতে করতে খাওয়া-দাওয়ায় মন শান্ত হলো। বহু বছর পরে পুজোর সেই আনন্দের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো, ভালো লাগার প্রলেপে অস্থির মনকে কিছুটা প্রশান্ত করেছিল।
এই পুজো আমাকে শিখিয়েছে—শোকের মাঝেও ছোট ছোট আনন্দ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। হয়তো পুরনো দিনের মতো আনন্দ ফিরে আসবে না, কিন্তু নিজের ছোটখাটো মুহূর্তগুলোয় শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। জীবনের এই যন্ত্রণা আর আনন্দের মিশ্র অনুভূতি হয়তো সব পুজোরই অংশ।
ব্যালকনির উপর উড়ালপুল! নাগপুরের সেতু স্মরণ করাচ্ছে ভোপালের ৯০ ডিগ্রি রেলসেতুর ঘটনার কথা