সন্ত্রাস দমনের অভিজাত বাহিনী ‘ব্ল্যাক ক্যাটস’!
ভারতের অন্যতম সেরা সন্ত্রাস দমন বাহিনী ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (NSG) বা জনপ্রিয় নাম ‘ব্ল্যাক ক্যাটস’। ১৯৮৬ সালে গঠিত এই বাহিনী বহু ঐতিহাসিক অভিযানে ভারতের গর্ব বাড়িয়েছে—অপারেশন ব্ল্যাক থান্ডার, অক্ষরধাম মন্দিরে সন্ত্রাসবাদী হামলা প্রতিরোধ, ২৬/১১ মুম্বই হামলা, সাম্প্রতিক অপারেশন সিঁদুর—সবেতেই এনএসজি-র ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
এনএসজি বাহিনী গঠনের পটভূমি
১৯৮০-র দশকে ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ভারত সরকারকে বিশেষ বাহিনী গঠনে বাধ্য করে। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলে পাশ হয় NSG অ্যাক্ট, ১৯৮৬, এবং গড়ে ওঠে এই বাহিনী। জার্মানির GSG-9 ও ব্রিটেনের SAS-এর ধাঁচে তৈরি হয় এনএসজি। বাহিনীটির দুটি প্রধান বিভাগ—স্পেশ্যাল অ্যাকশন গ্রুপ (SAG), যেখানে সেনা সদস্যরা সরাসরি অভিযানে অংশ নেন, এবং স্পেশ্যাল রেঞ্জার গ্রুপ (SRG), যেখানে সিআরপিএফ বা বিএসএফ-এর মতো বাহিনীর সদস্যরা সাপোর্ট টিম হিসেবে কাজ করেন।
এনএসজি-তে যোগদানের যোগ্যতা
এনএসজি বাহিনীতে সরাসরি নিয়োগ হয় না। শুধুমাত্র ডেপুটেশন প্রক্রিয়ায় ভারতীয় সেনা, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশবাহিনীর (CRPF, BSF, ITBP, CISF) অভিজ্ঞ সদস্যদের বাছাই করা হয়।
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ডিগ্রি।
- বয়স: সর্বাধিক ৩৫ বছর।
- অভিজ্ঞতা: ন্যূনতম তিন বছরের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা আবশ্যক।
- শারীরিক মাপকাঠি: ন্যূনতম উচ্চতা ১৬৫ সেন্টিমিটার, দূরদৃষ্টি ৬/৬, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মানসিক সক্ষমতার কঠোর মূল্যায়ন হয়।
- ফিটনেস পরীক্ষা: ছ’মিনিটে ১৬০০ মিটার দৌড়, সাঁতারের দক্ষতা, দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়েও সক্রিয় থাকার ক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়।
প্রশিক্ষণ ও বাছাই প্রক্রিয়া
এনএসজি বাহিনীতে যোগ দিতে হলে পাঁচটি ধাপ পেরোতে হয়—ডেপুটেশন, সম্মতিপত্র জমা, প্রাথমিক বাছাই, কঠোর প্রশিক্ষণ এবং চূড়ান্ত বাছাই। গুরুগ্রামের মানেসরে অবস্থিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রে নয় মাস ধরে চলে কঠিন মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি। এখানে ভয় নিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলা, নিঃশব্দে অভিযান চালানোর মতো বিশেষ কৌশল শেখানো হয়। গড়ে মাত্র ১০-১৫ শতাংশ প্রার্থীই প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারেন।
দায়িত্ব ও কাজের ধরন
এনএসজি বাহিনী মূলত সন্ত্রাস দমন, বিমান ছিনতাই প্রতিরোধ, বোমা নিষ্ক্রিয়করণ, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুরক্ষা এবং উদ্ধার অভিযানে কাজ করে। প্রতিটি অভিযানের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটি পরিকল্পনা তৈরি করে। কালো পোশাক, হেলমেট, গ্লাভস এবং মাস্ক পরে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে চলাফেরার জন্য এই বাহিনী পেয়েছে ‘ব্ল্যাক ক্যাটস’ নামটি।
জীবনের কঠোরতা
এনএসজি সদস্যদের দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। কাজের চাপ ২৪x৭, যোগাযোগ সীমিত। তবুও দেশের সুরক্ষায় এই বাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম। উচ্চ বেতন, সম্মান এবং দায়িত্বের পাশাপাশি এই কাজের জন্য প্রয়োজন দেশের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধ, আত্মবিশ্বাস এবং একাগ্রতা।
এনএসজি বাহিনীর সদস্য হওয়া শুধু একটি চাকরি নয়, এটি এক বিশাল গৌরব ও আত্মত্যাগের প্রতীক। যদি নিজের শারীরিক ক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং দেশের জন্য কাজ করার ইচ্ছাশক্তিতে ভরসা থাকে, তবে আপনিও হয়ে উঠতে পারেন ভারতের সেরা যোদ্ধাদের একজন—একজন গর্বিত ব্ল্যাক ক্যাট।