৬০০ কোটির সম্পত্তির মালকিন থেকে নির্মম পরিণতি!
এক সময় কর্নাটকের সমাজে এক পরিচিত মুখ ছিলেন শাকিরা খলিলি। ছিলেন সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক, সঙ্গে মাইসুরু রাজপরিবারের রক্ত। কিন্তু যে জীবন শুরু হয়েছিল রাজকীয় চাকচিক্যে, তা শেষ হয়েছিল এক ভয়ঙ্কর পরিণতিতে—নিজের বাড়ির উঠোনে কাঠের বাক্সে জ্যান্ত পুঁতে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে।
সুখী জীবন, প্রভাবশালী পরিবার
শাকিরা ছিলেন দেওয়ান মির্জা ইসমাইলের নাতনি। তাঁর বিয়ে হয়েছিল আইএফএস অফিসার আকবর মির্জা খলিলির সঙ্গে। আকবরের বিদেশের পোস্টিং থাকায় শাকিরাও প্রথমদিকে বিদেশেই থাকতেন। চার কন্যার জননী হয়েও তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব, সামাজিক অবস্থান এবং পরিবারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তাঁর মা তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন বেঙ্গালুরুর রিচমন্ড রোডে একটি রাজপ্রাসাদসদৃশ বাড়ি এবং বিপুল সম্পত্তি।
‘গুরু’র আবির্ভাব ও সম্পর্কের পরিবর্তন
১৯৮২ সালে এক বিয়েতে আলাপ হয় এক স্বঘোষিত ধর্মগুরু শ্রদ্ধানন্দের সঙ্গে (আসল নাম মুরলী মনোহর মিশ্র)। খুব দ্রুতই তিনি শাকিরা ও তাঁর পরিবারের আস্থা অর্জন করেন। আর্থিক ও সম্পত্তিগত বিষয় দেখভালের দায়িত্ব পান তিনি। ধীরে ধীরে শাকিরার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
১৯৮৫ সালে আকবর ও শাকিরার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ছয় মাসের মধ্যেই শাকিরা বিয়ে করেন শ্রদ্ধানন্দকে, পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করেই। মেয়েরা এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি, তিন জন সম্পর্ক ছিন্ন করেন। শুধু বড় মেয়ে সাবা কিছুদিন যোগাযোগ রাখেন।
সম্পর্কের অবনতি ও ষড়যন্ত্র
বিয়ের পর পাঁচ বছর যেন সব ঠিকঠাকই চলছিল। শ্রদ্ধানন্দ একাধারে স্বামী, আবার সম্পত্তির ‘ম্যানেজার’। কিন্তু ১৯৯১ সাল নাগাদ সম্পর্কে চিড় ধরে। শাকিরার বিপুল সম্পত্তির ওপর নজর পড়ে শ্রদ্ধানন্দের। তখনই তিনি পরিকল্পনা করেন শাকিরাকে সরিয়ে দেওয়ার।
তিনি বাড়ির পরিচারকদের দিয়ে একটি বড় কাঠের বাক্স তৈরি করান, জানান সেখানে গয়না রাখা হবে। পাশাপাশি বাড়ির পিছনে খোঁড়াতে থাকেন একটি বড় গর্ত—বলা হয়, জলের ট্যাঙ্ক বসানো হবে।
ভয়াবহ খুন
১৯৯১ সালের ২৮ এপ্রিল। চায়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে শাকিরাকে অচৈতন্য করেন শ্রদ্ধানন্দ। পরে তাঁকে সেই কাঠের বাক্সে ভরে, বাড়ির পিছনে বানানো গর্তে জ্যান্ত পুঁতে দেন। শ্বাসরোধেই মৃত্যু হয় শাকিরার।
মেয়ে সাবা ১৯৯২ সালে পুলিশে নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তদন্তের তিন বছর পর ১৯৯৪ সালে পুলিশ শাকিরার দেহাবশেষ উদ্ধার করে এবং শ্রদ্ধানন্দকে গ্রেফতার করে। ময়নাতদন্তে স্পষ্ট হয়—জ্যান্ত পুঁতে দেওয়ায় মৃত্যু হয়েছে।
বিচার ও শাস্তি
২০০০ সালে নিম্ন আদালত শ্রদ্ধানন্দকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ২০০5 সালে হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখে। তবে ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই সাজা বদলে দিয়ে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। বর্তমানে শ্রদ্ধানন্দ সাগর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি, বয়স ৮০ ছাড়িয়েছে।
উপসংহার
শাকিরা খলিলির জীবন ছিল ঐশ্বর্যের ছোঁয়া ও হৃদয়বিদারক পরিণতির এক করুণ কাহিনি। এক সময়ের রাজকীয় কন্যা, প্রেমে বিভোর হয়ে বিশ্বাস করেছিলেন ভুল মানুষকে—আর তার মাশুল দিতে হয়েছিল নিজের জীবন দিয়েই। এই ঘটনা শুধু এক নারীর ট্র্যাজেডি নয়, বরং এক ভয়ংকর শিক্ষা, যে অন্ধ বিশ্বাস কতটা মারাত্মক হতে পারে।