ইন্দোনেশিয়ার শক্তি বৃদ্ধি!
ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমশই শক্তির ভারসাম্য বদলাচ্ছে। এই অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে, যা অনেক দেশকেই প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য করছে। ইন্দোনেশিয়া এবার ইতালীয় বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘আইটিএস জিউসেপ্পে গ্যারিবল্ডি’ অধিগ্রহণের পরিকল্পনা করছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি বড় সামরিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কেন ‘গ্যারিবল্ডি’ চাইছে ইন্দোনেশিয়া?
১৯৮৫ সাল থেকে ইতালীয় নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল ‘গ্যারিবল্ডি’। এটি একটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, যা লড়াকু জেট ও হেলিকপ্টার বহনে সক্ষম। তবে ২০২৩ সালে ইতালি নতুন ‘ট্রিয়েস্তে’ হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার চালু করার পর পুরনো যুদ্ধজাহাজটিকে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাকার্তা দ্রুত ‘গ্যারিবল্ডি’ অধিগ্রহণের জন্য ইতালির সঙ্গে আলোচনায় বসে।
সূত্র অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া চাইছে ‘গ্যারিবল্ডি’র কাঠামো কিছুটা পরিবর্তন করে নিজেদের উপযোগী করে নিতে। বিশেষ করে, রণতরীটিতে ভার্টিক্যাল ল্যান্ডিং ফিচার সংযোজন এবং যুদ্ধবিমান বহরের উন্নয়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মলাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণের লড়াই
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মলাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের ২৫% সামুদ্রিক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। যদি চীনা নৌবাহিনী এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে, তবে ইন্দোনেশিয়ার কৌশলগত অবস্থান হুমকির মুখে পড়বে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘গ্যারিবল্ডি’ অধিগ্রহণ করলে ইন্দোনেশিয়া চীনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে। এটি শুধুমাত্র প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বরং মানবিক সহায়তা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ইন্দোনেশিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণ
বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া ন্যূনতম অপরিহার্য বাহিনী (MEF) উন্নত করতে চারটি নতুন হেলিকপ্টার ক্যারিয়ার, চারটি ফ্রিগেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই তারা:
- তুরস্ক থেকে কেসিআর ক্লাস ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজ কিনেছে।
- জাপানের কাছ থেকে দুইটি টহলদারি জাহাজ পেয়েছে।
- দেশীয় প্রযুক্তিতে নতুন যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে।
- ভারতের ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে।
‘গ্যারিবল্ডি’ কতটা শক্তিশালী?
প্রায় ৮০০ ফুট দীর্ঘ এবং ৩০.৫ মিটার চওড়া এই যুদ্ধজাহাজটি ১৬টি যুদ্ধবিমান ও ১৮টি হেলিকপ্টার বহন করতে পারে। এতে ৮১ হাজার হর্সপাওয়ারের শক্তিশালী ইঞ্জিন রয়েছে, যা ঘণ্টায় ৩০ নটিক্যাল মাইল গতিতে চলতে সক্ষম। এই রণতরী সাত হাজার নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত টানা অভিযান চালাতে সক্ষম।
‘গ্যারিবল্ডি’ ইতিপূর্বে সোমালিয়া, যুগোস্লাভিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া এবং লেবাননে বহু সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। এটি শুধু যুদ্ধের সময় নয়, মানব পাচার রোধ, দুর্যোগকালীন ত্রাণ সরবরাহ ও অন্যান্য সামরিক অভিযানে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ইন্দোনেশিয়ার এই পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই বেইজিংকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। চীন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশ যদি বিমানবাহী রণতরী সংগ্রহ করে, তবে চীনের এই অঞ্চলে সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
শেষ কথা
ইন্দোনেশিয়ার ‘গ্যারিবল্ডি’ অধিগ্রহণের প্রচেষ্টা শুধুমাত্র সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ নয়, বরং এটি একটি বড় কৌশলগত চাল। এটি চীনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি সফল হলে ইন্দোনেশিয়া সামরিক শক্তির দিক থেকে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।