নবগঠিত কোর কমিটি স্থগিত!
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছিলেন। তার নির্দেশ ছিল, কমিটির সদস্যরা পর্যায়ক্রমে প্রতিদিন তৃণমূল ভবনে বসবেন এবং দলের সাংগঠনিক কার্যকলাপ পরিচালনা করবেন। আট দিন পর, বৃহস্পতিবার, ওই কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাত পেরোতেই দলীয় নির্দেশে কোর কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক দলের অন্দরে নানা রকম আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রবীণদের বার্তা?
তৃণমূলের অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করছেন, এই আকস্মিক পরিবর্তনের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের প্রবীণ নেতাদের উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, তবে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে যে, নবগঠিত কোর কমিটি নিয়ে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে না জানানোয় অসন্তুষ্ট হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, কোর কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মমতাকে সম্পূর্ণরূপে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল, যা তিনি পরে জানতে পারেন। তার পরেই এই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।
কোর কমিটি ঘোষণার পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী কোর কমিটি গঠনের ঘোষণা করেন। ফলে অনেক প্রবীণ নেতা ধরে নিয়েছিলেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে মমতার অনুমোদন রয়েছে। কারণ, সাধারণত দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বক্সী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। কিন্তু পরে জানা যায়, মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তাই এই কমিটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এর কাঠামো কী হবে, তা দলনেত্রী নিজেই ঠিক করবেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক নিয়েও জল্পনা
এই ঘটনার পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ মার্চ নির্ধারিত ভার্চুয়াল বৈঠকের ঘোষণার পদ্ধতি নিয়েও দলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে অভিষেক উপস্থিত ছিলেন না, তবে মমতার গঠিত কমিটির দ্বিতীয় নাম ছিল তাঁর। বৈঠকের একেবারে শেষ পর্যায়ে অভিষেকের বৈঠকের ঘোষণা করা হয়, কিন্তু তখন অনেক নেতাই সভাস্থল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অনেকে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন।
এ নিয়ে দলে প্রশ্ন উঠছে, কেন অভিষেকের বৈঠকের সূচি বৈঠকের শুরুতেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলো না? কেন শেষ মুহূর্তে ‘ভাঙা হাটে’ এই ঘোষণা করা হলো? দলীয় মহলে এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে, কোর কমিটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত এবং অভিষেকের বৈঠকের ঘোষণা একই সূত্রে গাঁথা।
সংসদ অধিবেশনের যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
কোর কমিটি স্থগিত রাখার পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে দলের একাংশের মধ্যে। দলীয় নেতৃত্বের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদ ও বিধানসভার অধিবেশন রয়েছে। তাই সাংসদ-বিধায়কদের কোর কমিটিতে রাখলে সাংগঠনিক কাজকর্মে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে। তবে অনেকেই এই যুক্তিকে যথাযথ মনে করছেন না, কারণ তৃণমূল রাজ্যের শাসক দল এবং সংসদেও বিরোধী শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে সংসদ অধিবেশনের সূচি জানা সত্ত্বেও এত বড় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা কিছুটা অবাক করার মতো বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বার্তা স্পষ্ট: সিদ্ধান্ত নেবেন মমতা
এই পুরো ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও দলে তাঁর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব। গত কয়েক মাস ধরে মমতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি দলের সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে শেষ কথা বলবেন। প্রবীণ নেতাদের একাংশ এই অবস্থানকে নিজেদের পক্ষে মনে করলেও, তারা সম্ভবত কিছুটা আগেভাগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষমেশ মমতা বুঝিয়ে দিলেন, দলের নিয়ন্ত্রণ এখনও পুরোপুরি তাঁর হাতেই রয়েছে।
এই ঘটনাগুলি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতৃত্বের ভারসাম্য এখনও মমতার দিকেই ঝুঁকে রয়েছে। ভবিষ্যতে দলের সাংগঠনিক কাঠামো এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা এখন দেখার বিষয়।
ভারতের উপর পাল্টা শুল্ক চাপাচ্ছেন ট্রাম্প! ঘোষণা করলেন নির্দিষ্ট তারিখও