হারিয়ে যাওয়া বাইজিদের লড়াই: চন্দ্রা চক্রবর্তীর অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা

বাইজিদের লড়াই! সঙ্গীত জগতে পুরুষশাসিত ধারা আজও বহাল। যদিও অনেক নারী শিল্পী সফল হয়েছেন, তবে গান তৈরির ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রাধান্য যেন অটুট। কিন্তু সত্যিই কি সঙ্গীতের ইতিহাস কেবল পুরুষদের দিয়েই…

March 8, 2025
1 min read

বাইজিদের লড়াই!

সঙ্গীত জগতে পুরুষশাসিত ধারা আজও বহাল। যদিও অনেক নারী শিল্পী সফল হয়েছেন, তবে গান তৈরির ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রাধান্য যেন অটুট। কিন্তু সত্যিই কি সঙ্গীতের ইতিহাস কেবল পুরুষদের দিয়েই রচিত? ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, একসময় ‘বাইজি’ বা ‘তওয়ায়েফ’রা ছিলেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু তাঁদের প্রতিভার চেয়ে সমাজ তাঁদের ‘যৌনকর্মী’ পরিচয়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

বেগম আখতার, গওহরজানদের নাম ইতিহাসে ঠাঁই পেলেও অসংখ্য প্রতিভাবান বাইজি বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছেন। এই হারিয়ে যাওয়া নারীদের কাহিনি সামনে আনার ব্রত নিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী চন্দ্রা চক্রবর্তী।

শৈশব থেকেই কৌতূহল

চন্দ্রার সঙ্গীত শিক্ষা শুরু কাটোয়া থেকে। গুরু পণ্ডিত এ কানন ও মালবিকা কাননের সান্নিধ্যে তিনি বেড়ে ওঠেন। তাঁদের বাড়ির এক কোণায় ছিল বিশাল এক বেগম আখতারের ছবি। প্রতিদিন গণেশের সঙ্গে তাঁর প্রতিও পুষ্পার্ঘ্য দিতেন মালবিকা কানন। ছোট থেকেই চন্দ্রার মনে প্রশ্ন জেগেছিল— এই শিল্পীর প্রতি এত শ্রদ্ধা কেন? তিনি কী করেছিলেন?

ক্রমে তিনি বুঝতে পারেন, বাইজিরা কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন সুরের সাধক। তবুও সমাজ তাঁদের স্বীকৃতি দেয়নি। এই ভাবনা থেকেই চন্দ্রা সিদ্ধান্ত নেন, বাইজিদের জীবন নিয়ে গবেষণা করবেন।

গবেষণার পথে বাধা

গওহরজান, বেগম আখতারদের জীবনী নিয়ে বই লেখা হয়েছে, রেকর্ড সংরক্ষিত হয়েছে। কিন্তু বাকিদের ইতিহাস প্রায় অজ্ঞাত। তথ্য সংগ্রহের জন্য চন্দ্রা বারাণসী, লখনউ, দিল্লি, আগ্রা ঘুরে বেড়ান। দিল্লিতে তিনি ‘মুসলিম বাই’-এর সম্পর্কে জানতে পারেন, যাঁর গলায় অমূল্য ঠুংরি রচিত হয়েছিল। কিন্তু আজ তাঁর নামও কেউ জানে না।

চন্দ্রার ভাষায়, ‘‘আমরা আজও ঠুংরি গাই, কিন্তু সৃষ্টিকারীর নাম নেই! এটা তো অন্যায়!’’

এই ভাবনা থেকেই তিনি ‘টেল অফ তওয়ায়েফ’ নামে এক মিউজিক্যাল পরিবেশনার সূচনা করেন। লন্ডনে মঞ্চস্থ এই অনুষ্ঠানে বেগম আখতারের ভূমিকায় অভিনয় করেন স্বয়ং চন্দ্রা। তাঁর গান আর অভিনয়ের মাধ্যমে বাইজিদের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন তিনি।

সংস্কৃতি হারানোর দায় কার?

একসময় কলকাতার চিৎপুর, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট, লালবাজার ছিল বাইজিদের বাসস্থান। কিন্তু ব্রিটিশরা এসে এই সংস্কৃতির ধ্বংস সাধন করে। ‘তওয়ায়েফ’ শব্দ বদলে তাদের পরিচিত করা হয় ‘নচনি’ নামে। ফলে সমাজের মূলধারার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয় তাঁদের।

তবে চন্দ্রার মতে, ‘‘ব্রিটিশরা নিষিদ্ধ করলেও, আমরাই তো নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতাম!’’

প্রতিবন্ধকতাকে জয় করা

চন্দ্রার গবেষণা সহজ ছিল না। ভারতের এক নামী সঙ্গীত মঞ্চে তাঁকে গান গাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে শর্ত ছিল— বাইজিদের নাম নেওয়া যাবে না! এই অন্যায় মানতে পারেননি চন্দ্রা। তাঁর জেদ আরও বেড়ে যায়।

এমনকি দিল্লির চৌরিবাজারে বাইজিদের পুরনো বাড়ি দেখতে গেলে তাঁকে হুমকির সম্মুখীন হতে হয়। বলা হয়, ‘‘এখান থেকে চলে যান, নইলে বিপদ হতে পারে।’’ কিন্তু তিনি দমে যাননি।

শিল্পীর সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণা

এই গবেষণার মধ্যেই চন্দ্রা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তৃতীয় পর্যায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে তাঁর। কিন্তু অস্ত্রোপচারের মাত্র এক সপ্তাহ পরেই তিনি ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কাজে ফেরেন।

‘‘বাইজিরা এত লড়াই করেছেন, আমি কেন থামব?’’— চন্দ্রার এই মনোভাবই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি ‘সাহানাদেবী’ ও ‘জোহরাবাই’কে নিয়ে একটি মিউজিক্যাল পরিবেশন করেন, যেখানে মহিলাদের লড়াইয়ের কথা উঠে আসে।

সংগ্রাম এখনো চলমান

কলকাতার প্রখ্যাত বাইজি ইন্দুবালার নাম কেউ জানে না। চন্দ্রা এক অনুষ্ঠানে তাঁর কথা বলেন। ছোট আয়োজনে হলেও দর্শকদের চোখে জল আসে ইন্দুবালার কাহিনি শুনে।

চন্দ্রার স্বপ্ন, একদিন বাইজিরা তাঁদের যোগ্য সম্মান ফিরে পাবেন। তাঁর ভাষায়, ‘‘তওয়ায়েফরা কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন ভারতীয় সঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম চরিত্র।’’

আজও তাঁর পথচলা অব্যাহত। বাইজিদের প্রতি অবিচার রুখতে এবং তাঁদের স্বীকৃতি দিতে চন্দ্রা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভারতের উপর পাল্টা শুল্ক চাপাচ্ছেন ট্রাম্প! ঘোষণা করলেন নির্দিষ্ট তারিখও

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *