তুষার অভিযানের রোমহর্ষক কাহিনি
বরফের রাজ্যে অসীম সাহসিকতার নিদর্শন স্থাপন করেছিলেন ডগলাস মাওসন। এই নামটি মেরু অন্বেষণের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা। আন্টার্কটিকার মতো প্রতিকূল অঞ্চলে এক বিভীষিকাময় অভিযানের পর এককভাবে ফিরে আসার ঘটনাটি ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। মাওসনের এই সাহসিক অভিযান একদিকে যেমন বিপদসঙ্কুল, তেমনি মানবতার সীমাহীন সংকল্পের উদাহরণ।
অভিযানের সূচনা
১৯১২ সালে মাওসন তাঁর দুই সঙ্গী বেলগ্রেভ নিনিস এবং জেভিয়ের মার্টজ়কে সঙ্গে নিয়ে আন্টার্কটিকায় পাড়ি দেন। উদ্দেশ্য ছিল কুমেরু অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি এবং খনিজ গবেষণা। ৭৮০ কেজি সরঞ্জাম ও খাদ্য নিয়ে তাঁরা যাত্রা শুরু করেন। প্রথম দিকে কাজ বেশ এগোচ্ছিল। কিন্তু ১৩ ডিসেম্বর তাঁদের দলের দুর্ভাগ্যের পালা শুরু হয়।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনা
১৩ ডিসেম্বর নিনিসের স্লেজসহ হাস্কি কুকুরগুলো একটি গভীর বরফের খাদে পড়ে যায়। এতে খাদ্য, সরঞ্জাম সবকিছুই হারিয়ে যায়। নিনিসও আর ফিরে আসেননি। মাওসন ও মার্টজ় বিপদজনক পরিস্থিতিতে পড়েন। হাতে রইল মাত্র দেড় সপ্তাহের খাবার। বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁরা অসুস্থ কুকুরগুলোকে মেরে মাংস খেতে বাধ্য হন।
মার্টজ়ের মৃত্যু
অভাব ও শারীরিক দুর্বলতায় মার্টজ়ের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৯ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শোক ও একাকিত্বে কাতর মাওসন তাঁর সঙ্গীকে বরফের নিচে সমাহিত করেন। এই অবস্থায় একাকী বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন মাওসন।
প্রকৃতির নির্মমতা ও মাওসনের লড়াই
মাওসন বরফের মাঝে ভয়ঙ্কর তুষারঝড় ও তীব্র ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করেন। তাঁর পায়ের চামড়া ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। খাবারের অভাবে শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে প্রায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ১ ফেব্রুয়ারি একটি গুহায় আশ্রয় নিয়ে পাঁচ দিন অবস্থান করেন।
অবশেষে ফিরে আসা
তুষারঝড় কমলে তিনি বেস ক্যাম্পে পৌঁছান। অস্ট্রেলিয়ার উদ্ধারকারী জাহাজ ‘অরোরা’ তাঁকে উদ্ধার করে। তবে দীর্ঘ এই সংগ্রামের কারণে তাঁর শরীরে হাইপারভিটামিনোসিস হয়, যা কুকুরের লিভার খাওয়ার ফলে হয়েছিল।
উত্তরাধিকার
১৯১৪ সালে মাওসন তাঁর এই অভিযানের জন্য নাইট উপাধি লাভ করেন। তিনি অ্যান্টার্কটিকার বৃহৎ অংশের মানচিত্র তৈরি করেন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে তাঁর জীবনাবসান হয়।
উপসংহার
মাওসনের এই অভিযান কেবল এক দুঃসাহসিক অভিযাত্রীর কাহিনি নয়; এটি মানবতার সাহস, সংকল্প ও বিপদে অদম্য থাকার উদাহরণ। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাওসন যেভাবে নিজের জীবন বাঁচিয়েছিলেন, তা বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবে।