স্যালাইনের ত্রুটিতে প্রসূতিদের মৃত্যুর কারণ
স্যালাইনের ত্রুটি ও অক্সিটোসিনের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত আলোচনা এখন নতুন করে সামনে আসছে। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়টির উপর নজর না দেওয়ার ফলেই একাধিক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একই স্যালাইন ব্যবহার করার পরেও অন্যান্য ওয়ার্ডের রোগীদের তেমন বড় কোনও সমস্যা না হলেও, কেন শুধুমাত্র প্রসূতিরাই মারাত্মক শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছেন?
বিষয়টি ঠিক কী?
ডায়মন্ড হারবার, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল, এসএসকেএম, আরামবাগ এবং উত্তরপাড়ার একাধিক সরকারি হাসপাতালে প্রসূতিদের মৃত্যুর ঘটনা গত এপ্রিল থেকেই আলোচনায়। অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি (এ কে আই), শ্বাসজনিত সমস্যা (এ আর ডি এস) এবং রক্তনালীর ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতাগুলি দেখা দিচ্ছে শুধুমাত্র প্রসূতির মধ্যেই। অথচ অন্যান্য রোগীর ক্ষেত্রে একই স্যালাইন ব্যবহার করার পর জ্বর বা কাঁপুনি ছাড়া বড় কোনও সমস্যা হচ্ছে না।
স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞরা বারবার স্যালাইনের সঙ্গে মেশানো অক্সিটোসিনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, সঠিক মান না মেনে উৎপাদিত অক্সিটোসিন প্রসূতিদের শরীরে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। কিন্তু সেই সময় তাঁদের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য দফতরের দৃষ্টিকোণ
মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের সাম্প্রতিক ঘটনায় স্যালাইনের ত্রুটি প্রকাশ্যে আসার পর, স্বাস্থ্য ভবনে বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয়েছে। যদিও আপাতত দফতর সূত্রে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জানা গিয়েছে, কর্নাটকের একটি সংস্থা, যাদের কাছ থেকে অক্সিটোসিন সরবরাহ করা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এক শীর্ষ কর্তা। সংস্থার কাছ থেকে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে তা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, “এখনই কোনও মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে অক্সিটোসিনের উৎপাদন এবং সরবরাহ নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বেঙ্গল অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি বাসব মুখোপাধ্যায় এই বিষয়টিকে “অনিয়ম এবং উদাসীনতার” ফলাফল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “সময়ে সতর্ক হলে এতগুলো প্রাণ এভাবে অকালে ঝরে যেত না। অক্সিটোসিন এবং ভ্যাসোপ্রেসিন—দুটিই পেপটাইড হরমোন। যদি কোনওভাবে উৎপাদনের সময় একটির বদলে অন্যটি ব্যবহার হয়, তবে তার ফল হতে পারে ভয়াবহ।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার অক্সিটোসিনের মান নিশ্চিত করার উপর জোর দিলেও, রাজ্যে এই বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালে কর্নাটকের ওই সংস্থার সরবরাহ করা অক্সিটোসিনের মান নিয়ে আইএমএ প্রশ্ন তুলেছিল। তারপরও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।
অতিরিক্ত অক্সিটোসিন নাকি মানের ত্রুটি?
তদন্তে অতিরিক্ত অক্সিটোসিন ব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে। তবে একজন স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, “মাত্র ২ ইউনিট অক্সিটোসিন ব্যবহার করার পরও এক প্রসূতির জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাই এটি শুধুমাত্র অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে হচ্ছে বলে মনে হয় না। বরং উৎপাদনের মান এবং স্যালাইনের মিশ্রণ নিয়ে বিশদে পরীক্ষা করা জরুরি।”
কীভাবে প্রতিরোধ করা যেতে পারে?
বিভিন্ন স্তরের চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা এড়াতে দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
- অক্সিটোসিনের মান নিশ্চিতকরণ: সরবরাহকারী সংস্থার উপর নজরদারি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার যথাযথ পরীক্ষা।
- স্যালাইনের গুণমান পরীক্ষা: প্রতিটি হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ব্যবহৃত স্যালাইনের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরীক্ষা।
- প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি: স্ত্রীরোগ চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি।
- দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা: কোনও অনিয়ম বা সমস্যার সূত্র ধরেই দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।
শেষ কথা
প্রসূতিরা শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার অংশ নন, তাঁদের জীবন রক্ষার জন্য যথাযথ দায়িত্ব পালন করা প্রতিটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কর্তব্য। স্যালাইন এবং অক্সিটোসিনের মানের ত্রুটি যদি এতগুলো প্রাণের জন্য দায়ী হয়, তবে এটি উদাসীনতা এবং অব্যবস্থার চরম উদাহরণ। এখন সময় এসেছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার, যাতে আর কোনও প্রসূতির প্রাণ অকালে ঝরে না যায়।
সত্যিকারের সাধ্বী নাকি শুধুই লোকদেখানো! নেটপ্রভাবী হর্ষা রিচারিয়া নিয়ে কেন এত বিতর্ক?