ভয়ের সীমানা পার করে নুহাশের
নুহাশ হুমায়ুনের সাম্প্রতিক ওয়েব সিরিজ ‘দুই ষ’ ভয়ের পরিচিত সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক অনন্য চিত্রভাষা উপস্থাপন করে যা দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্রে আগে দেখা যায়নি। এই সিরিজের মূল ভিত্তি, ‘শ’ ও ‘ষ’–এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতীকী দ্বন্দ্ব। শয়তান বা ইবলিশের প্রতিফলন যেখানে ‘শ’-এর সঙ্গে জড়িয়ে, সেখানে ‘মানুষ’ শব্দের শেষ বর্ণ ‘ষ’ যেন সেই ফারাকের প্রতীক। এই অনুপ্রেরণাতেই গড়ে উঠেছে চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবির জাল, যা একসঙ্গে হয়ে উঠেছে বিস্ময়কর, গভীর এবং অতিপ্রাকৃত।
সিরিজের গল্পগুলোর সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ
প্রথম গল্প ‘ওয়াক্ত’—পাঁচ যুবকের কুকর্ম, একটি মসজিদে আজান এবং তাদের মৃত্যু। এই গল্পে ধর্মীয় বিশ্বাস ও পাপবোধের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। সিরিজের মূলধারার সঙ্গে এটি বুনে দেয় মানবিক পাপ ও ইবলিশি শক্তির গভীর টানাপোড়েন।
দ্বিতীয় গল্প ‘ভাগ্য ভালো’ এক ফুটপাত জ্যোতিষীর দুর্ভাগ্যের আখ্যান। নিজের ভাগ্য বদলাতে গিয়ে সে কীভাবে ইবলিশের জালে জড়িয়ে পড়ে, তা ধীরে ধীরে অনুধাবন করে। শয়তান এখানে পুঁজিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা শুধু শোষণ করে আর ভাগ্য শুষে নেয়।
‘অন্তরা’, তৃতীয় গল্প, আগের সিজন ‘পেট কাটা ষ’ থেকে একটি চরিত্রের পুনর্জন্মের কাহিনি। অন্তরা, এক সুখী গৃহবধূ, ধীরে ধীরে ইবলিশি মায়ার বাস্তবতা বুঝতে পারে। মুক্তি তার একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
চতুর্থ গল্প ‘বেসুরা’ একটি লোককথার আদলে নির্মিত। এক গ্রাম যেখানে শিল্প-সংস্কৃতির পূজা করা হয়, সেখানে বেসুরা এক বালিকা নিষিদ্ধ। ডাইনির সাহায্যে সুর পেয়ে গ্রামে ফিরে আসা তার মুক্তির পথকে জটিলতর করে। গল্পটি মানবজাতির প্রাচীন বিশ্বাস ও নিষিদ্ধতার ইতিহাসের সঙ্গে প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করে।
চিত্রভাষার অভিনবত্ব
নুহাশের কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর চিত্রভাষার অভিনবত্ব। এখানে লোকগাথা, পুরাণ, ধর্ম এবং আধুনিক সামাজিক বাস্তবতা এক অদ্ভুত মিশ্রণে রূপায়িত হয়েছে। সিরিজের গল্পগুলোর মাঝে নীতিবাক্য এবং রাজনৈতিক ইঙ্গিত একাধিক স্তরে উপস্থিত। বিশেষ করে প্রথম গল্পে রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত আর শেষ গল্পে আদিম মানবীর মিথের উপস্থিতি এই উপমহাদেশীয় সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
অভিনয় ও চরিত্রায়ণ
মোশারফ করিম, জয়া আহসান, এবং আফজাল হোসেন-এর অভিনয় সিরিজটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইবলিশের চরিত্রে আফজাল হোসেনের মায়াবী কিন্তু ভয়ংকর উপস্থিতি দর্শকদের মনকে আচ্ছন্ন করে। চঞ্চল চৌধুরীর বিশেষ ভূমিকাও চমকপ্রদ।
নুহাশের রাজনৈতিক বয়ান
সিরিজটির সবক’টি গল্পের ভেতরেই একটি সাধারণ প্রবাহ রয়েছে—শোষণ, পাপ, আর ইবলিশি প্রভাবের মাধ্যমে সমাজ ও রাজনীতির গভীর বিশ্লেষণ। ‘ভাগ্য ভালো’ গল্পে পুঁজিবাদী শোষণের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা ভয়ঙ্কর বাস্তব এবং সমকালীন। দ্বিতীয় গল্পে ব্যবহার করা মুখোশগুলো প্রথম গল্পের যুবকদের মুখোশের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সূত্রে দেখা যায়, নুহাশ তাঁর প্রতিটি গল্পের মাধ্যমে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মানচিত্র এঁকেছেন।
শেষের দিকে এক অনন্ত প্রশ্ন
শেষ গল্পের আদি মানবীর প্রতীকী উপস্থিতি প্রশ্ন তোলে, নুহাশ কি শয়তান ও মানুষের দ্বন্দ্বের বাইরে আরও গভীর কোনও সত্যকে ধরতে চেয়েছেন? শোষণ আর ইবলিশের গল্প কি শুধুই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ, নাকি তা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার ভাগ্যকেও চিত্রায়িত করে?
নুহাশের ভবিষ্যৎ দিশা
নুহাশ হুমায়ুনের কাজ এর আগেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে। ‘দুই ষ’ সেই পর্দা আরও খুলে দিয়েছে। সিনেমার চেনা ভাষার বাইরে গিয়ে তিনি এমন এক গল্প বলার পদ্ধতি উদ্ভাবন করছেন, যা বৈশ্বিক দর্শকদের জন্যও নতুন অভিজ্ঞতা। তাঁর চিত্রভাষা, গভীরতা, এবং ভয়াবহতাকে ব্যবহার করার পদ্ধতি এশীয় এবং পশ্চিমি সিনেমার সীমানা পেরিয়ে গেছে।
‘তুমিই আমার আলো’, হৃতিককে জন্মদিনে শুভেচ্ছায় ভরালেন প্রাক্তন স্ত্রী সুজ়ান ও প্রেমিকা সাবা