ভারতীয়দের কেনাকাটার অভ্যাসে বদল!
গত ১২ বছরে ভারতীয় পরিবারের খরচের ধরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার (এসবিআই) একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা জানিয়েছে, আগে যেখানে পরিবারের অধিকাংশ খরচ খাবারের পেছনে হতো, এখন সেই খরচ কমে অন্যান্য পণ্যের দিকে সরেছে। সমীক্ষাটি দেশজুড়ে শহর এবং গ্রামীণ উভয় অঞ্চলের পরিবারের মধ্যে এই পরিবর্তনের দিকগুলো তুলে ধরেছে।
খাবারের খরচ কমছে, বাড়ছে অন্য খাতে ব্যয়
২০১১-১২ আর্থিক বছরে গ্রামীণ এলাকায় পরিবারের মোট খরচের ৫২.৯% খাবারের জন্য বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ আর্থিক বছরে এটি কমে হয়েছে ৪৭.০৪%। একই সময়ে খাবার ছাড়া অন্যান্য খাতে খরচ বেড়ে হয়েছে ৫২.৯৬%।
শহরাঞ্চলে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। ২০১১-১২ সালে শহুরে পরিবারগুলির খরচের ৪২.৬২% ছিল খাবারের পেছনে, যা ২০২৩-২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯.৬৮%-এ। অন্যদিকে, খাবার বাদে খরচ বেড়ে হয়েছে ৬০.৩২%।
কেন এই পরিবর্তন?
এসবিআইয়ের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রথমত, আর্থিক উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এর বড় ভূমিকা পালন করছে। গ্রামীণ ও টিয়ার ২ এবং টিয়ার ৩ শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে খাবার বাদে অন্যান্য সামগ্রী কেনার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।
বিশেষত স্বাস্থ্য এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার খাতে খরচ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযানের মাধ্যমে বাড়িতে শৌচালয় নির্মাণে মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এটি গ্রামীণ এবং শহর উভয় অঞ্চলে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে।

পশ্চিমী সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক উদারীকরণের প্রভাব
নব্বইয়ের দশকে অর্থনীতির উদারীকরণ ভারতীয় সমাজে একটি নতুন মাত্রা এনেছে। মানুষ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হতে শুরু করেছে এবং পশ্চিমী সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিতি বেড়েছে। এটি কেনাকাটার অভ্যাসে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
আগে খাবারের পেছনে যে অর্থ খরচ হতো, এখন তা গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিস, বৈদ্যুতিক পণ্য, এবং ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মতো পরিষেবায় খরচ হচ্ছে। ওয়াশিং মেশিন, রেফ্রিজারেটর, এবং অনলাইন শপিং-এর ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
সরকারি নীতির প্রভাব
২০১৭ সালে চালু হওয়া পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) কেনাকাটার অভ্যাসে প্রভাব ফেলেছে। খাদ্য শস্য থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে জিএসটির হার কম থাকায় পণ্যগুলোর দাম কমেছে এবং এর চাহিদা বেড়েছে।
বিদ্যুৎ পরিষেবার উন্নয়নও এই পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। আগে গ্রামীণ অঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিষেবা ছিল সীমিত। বর্তমানে বিদ্যুৎ প্রায় সর্বত্র পৌঁছে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে।
ক্রেডিট কার্ড এবং ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার
ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ ভারতীয় পরিবারের মধ্যে খরচের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ২০১৪ সালে যেখানে দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা মাত্র ২ কোটি ছিল, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটিতে।
ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং ই-কমার্স সাইটের প্রসারের ফলে মানুষ এখন সহজেই পণ্য কেনাকাটা করতে পারছে। ফলে গ্রামীণ এবং আধা শহরের বাসিন্দাদের কেনাকাটার অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে।
স্বাস্থ্য এবং বিলাসবহুল পণ্যে ব্যয় বৃদ্ধি
এসবিআইয়ের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতীয় পরিবারগুলির স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যোগব্যায়াম, জিম, এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিষেবায় ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া গাড়ি কেনার প্রবণতা, বিদেশ ভ্রমণের খরচ, এবং বিলাসবহুল মদের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন অভ্যাসের প্রতিফলন
গ্রামীণ এবং শহুরে উভয় পরিবারই খাবারের খরচ কমিয়ে অন্য সামগ্রীতে বেশি খরচ করছে। এটি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং জীবনের মানোন্নয়নের প্রতিফলন। আগামী দিনেও এই ধারা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাড়ির লাগোয়া জমিতে সবজি বাগান করতে চান? বীজ পোঁতার আগে মনে রাখুন এই ৫টি বিষয়