মনমোহন সিংহের জীবনকাহিনি!
ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের জনক, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ—একটি নাম যা ভারতীয় ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। অত্যন্ত কৃতী ছাত্র থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া, তাঁর জীবন এক চমকপ্রদ এবং অনুপ্রেরণামূলক গল্প। ২৬ ডিসেম্বর, ২০২৪, ৯২ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি প্রয়াত হন।
ছাত্রজীবনে নজিরবিহীন সাফল্য
১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাবের গাহ গ্রামে জন্ম মনমোহনের। দেশভাগের পর তিনি শরণার্থী হয়ে ভারতে আসেন। অল্প বয়সে মাকে হারানোর পর ঠাকুমার কাছে মানুষ হন। প্রথমে উর্দু মাধ্যমের স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং পরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৮ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হন এবং শীর্ষে থাকেন। ১৯৫২ সালে স্নাতক এবং ১৯৫৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন অর্থনীতিতে। ক্লাসে কখনও দ্বিতীয় হননি—এমন একটি রেকর্ড তাঁকে ভারতের সবচেয়ে শিক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা
স্নাতকোত্তর শেষে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান। সেখানে অর্থনীতিতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে নজির গড়েন। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নাফিল্ড কলেজ থেকে ‘ডক্টর অফ ফিলোসফি’ ডিগ্রি অর্জন করেন। মনমোহনের পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিদেশে পড়াশোনার জন্য যথেষ্ট ছিল না। স্কলারশিপের উপর নির্ভর করেই তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান। কেমব্রিজ এবং অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘‘আমি বৃত্তি ব্যবস্থার পণ্য।’’ এই স্কলারশিপ তাঁর জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল।
কর্মজীবনের শুরু
বিদেশ থেকে ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে মনমোহন অধ্যাপক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রকের উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেন। এরপর তিনি প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে তিনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর হন এবং এই পদে তাঁর দক্ষতার জন্য ব্যাপক প্রশংসিত হন।
অর্থমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালে নরসিংহ রাওয়ের মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিংহ দায়িত্ব নেন। এই সময় ভারত আর্থিক সংকটে ছিল। মনমোহন সিংহ অর্থনৈতিক উদারীকরণ কর্মসূচি শুরু করেন, যা ভারতকে এক নতুন অর্থনৈতিক যুগে প্রবেশ করায়। তিনি সরকারি নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের রাস্তা খুলে দেন। যদিও এই সংস্কার নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে, তবে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে এক নতুন দিশা দেখান।
২০০৪ সালে কংগ্রেস তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করে। একটানা দশ বছর (২০০৪-২০১৪) তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন। তাঁর শাসনকালে দেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করে, যদিও তিনি কিছু বিতর্ক এবং সমালোচনার মুখোমুখি হন।
ব্যক্তিত্ব এবং শাসনের ধরণ
মনমোহন সিংহ তাঁর শান্ত, মিতভাষী এবং অধ্যবসায়ী ব্যক্তিত্বের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁকে ‘মৌনীমোহন’ বলে কটাক্ষ করলেও, দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে তিনি ‘দ্য সিং হু ওয়াজ কিং’ নামে পরিচিত হন। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি ঘোষণা করেন যে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না।
শেষ জীবন
বয়সজনিত অসুস্থতার কারণে মনমোহন সিংহ সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে তাঁকে শেষবার জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। তাঁর প্রয়াণে ভারত এক শিক্ষিত, ভদ্র এবং অনুপ্রেরণামূলক নেতা হারাল।
মনমোহন সিংহের জীবন শুধুমাত্র একটি সাফল্যের গল্প নয়, এটি আত্মপ্রত্যয়, অধ্যবসায় এবং শিক্ষার গুরুত্বের এক অনন্য উদাহরণ। একজন শরণার্থী থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা এই মহান নেতার জীবনের প্রতিটি ধাপ আগামী প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।