পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে!
লাখ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে একাধিক ফ্ল্যাট বুক করে রেখেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তবে কোনও ফ্ল্যাটই সম্পূর্ণ কেনেননি। নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে এই তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। তাদের দাবি, ফ্ল্যাট বুকিংয়ের মাধ্যমে পার্থ তাঁর দুর্নীতির টাকা সাদা করতেন এবং নিজের সম্পত্তির পরিমাণ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে তুলতেন।
ইডির চার্জশিটে নতুন তথ্য
সম্প্রতি আদালতে জমা দেওয়া নিয়োগ মামলার পঞ্চম অতিরিক্ত চার্জশিটে ইডি উল্লেখ করেছে, পার্থ চট্টোপাধ্যায় একাধিক সংস্থার মাধ্যমে আর্থিক তছরুপ করেছেন। তাঁদের তদন্তে উঠে এসেছে, ফ্ল্যাট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে পার্থ কখনও নিজের নাম ব্যবহার করতেন না। বরং রাজীব দে নামের এক ব্যক্তিকে সামনে রেখে এই কাজ করাতেন। রাজীবের পাশাপাশি সুরঞ্জিতা জানা নামের এক মহিলার নামও চার্জশিটে উঠে এসেছে। ইডি জানিয়েছে, পার্থের নির্দেশেই সুরঞ্জিতা বিভিন্ন নথিতে সই করতেন।
পার্থের মূলত দুটি সংস্থা— ইমপ্রোলাইন কনস্ট্রাকশনস প্রাইভেট লিমিটেড এবং এইচআরআই ওয়েল্থ ক্রিয়েশন রিয়েলটর্স প্রাইভেট লিমিটেড— ফ্ল্যাট বুকিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হতো। এই সংস্থাগুলির ডিরেক্টর পদে পার্থের স্ত্রী, জামাই এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বসানো হয়েছিল।
কৌশল: ফ্ল্যাট বুকিং, কিন্তু কেনা নয়
ইডি জানিয়েছে, কলকাতা ও শহরতলির বিভিন্ন জায়গায় পার্থ একাধিক ফ্ল্যাট বুক করেছিলেন। কোথাও পাঁচ লক্ষ টাকা, কোথাও ১৪ লক্ষ টাকা অগ্রিম দিয়েও বাকিটা পরিশোধ করেননি। ফ্ল্যাট বুকিংয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের সম্পদের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি ওই টাকার সঠিক ব্যবহারের প্রমাণ তৈরি করতেন।
রিভারব্যাঙ্ক ডেভেলপার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ইডেন রিয়্যাল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেড, এবং অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপের মতো বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করেছিলেন পার্থ। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই পুরো অর্থ পরিশোধ করেননি।
উদাহরণস্বরূপ:
- রিভারব্যাঙ্ক ডেভেলপার্স প্রাইভেট লিমিটেড: পার্থ ১ কোটি ৫১ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাট বুক করেছিলেন, কিন্তু ৫ লক্ষ টাকার বেশি দেননি।
- অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপ: ১৮৫০ স্কোয়্যারফুটের একটি বাংলো বুক করেন, যার মূল্য ছিল ৮২ লক্ষ টাকা। অগ্রিম দেন মাত্র ১৪ লক্ষ টাকা।
- ইডেন রিয়্যাল এস্টেট প্রাইভেট লিমিটেড: ৫০ লক্ষ টাকার ফ্ল্যাটের জন্য ৫ লক্ষ টাকা দিয়ে বুকিং করেছিলেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতি
বিভিন্ন নির্মাণ সংস্থা জানিয়েছে, টাকা চাইতে গেলে পার্থের নাম উল্লেখ করে তাদের ভয় দেখানো হতো। অনেক সংস্থা পার্থের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বুকিং বাতিল করতে সাহস পাননি।
কেন ফ্ল্যাট কেনা হতো না?
ইডির মতে, ফ্ল্যাট সম্পূর্ণ কেনা হলে দুর্নীতির টাকার খরচ সঠিকভাবে দেখানো কঠিন হতো। পাশাপাশি, অল্প টাকায় একাধিক ফ্ল্যাট বুক করে রাখলে নিজের সম্পত্তির পরিমাণও বেশি দেখানো যেত। এ ধরনের বিনিয়োগে অল্প খরচে অনেক সম্পত্তি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যায়।
ইডির পদক্ষেপ
ইডি ইতিমধ্যে ইমপ্রোলাইন এবং এইচআরআই সংস্থাগুলির বিভিন্ন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। চার্জশিটে আরও বলা হয়েছে, পার্থের স্ত্রী, জামাই এবং অন্যান্য ঘনিষ্ঠরা এই আর্থিক তছরুপে জড়িত ছিলেন।
উপসংহার
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই কৌশল দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকার সঠিক ব্যবহার দেখানোর একটি পরিকল্পিত পদ্ধতি ছিল। তবে ইডির তদন্তের মাধ্যমে এই কৌশল ফাঁস হয়ে গেছে। তাঁদের দাবি, এই ধরনের কৌশল রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্নীতির গভীরতাকেই তুলে ধরে।