এবার তোমার পালা ডাক্তার
২০০০ সালে বাশার আল আসাদ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হন। তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে প্রেসিডেন্ট ছিলেন তার বাবা। কিন্তু ২০১১ সালে শুরু হওয়া বিদ্রোহ আসাদের ২৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। সম্প্রতি বিদ্রোহীদের হাতে রাজধানী দামাস্কাস দখল হয়ে গেলে তিনি রাশিয়ায় আশ্রয় নেন। তবে এই পতনের বীজ রোপিত হয়েছিল ১৩ বছর আগে, মাত্র ১৪ বছরের এক কিশোরের আঁকা গ্রাফিটির মাধ্যমে।
এক কিশোরের প্রতিবাদ
২০১১ সালের গোড়ার দিকে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছিল। দক্ষিণ সিরিয়ার দারা শহরের এক দেওয়ালে ১৪ বছর বয়সি কিশোর মোউয়াইয়া সিয়াসনের আঁকা একটি গ্রাফিটি বিদ্রোহের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। স্প্রে-পেন্ট দিয়ে লেখা সেই গ্রাফিটিতে ছিল একটি বিশেষ বার্তা— “এজাক এল ডোর, ইয়া ডক্টর” (এবার তোমার পালা, ডাক্তার)।
আসাদ একসময় চিকিৎসক ছিলেন। সেনা চিকিৎসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গ্রাফিটির এই সরাসরি ইঙ্গিত আসাদের বিরুদ্ধে জনরোষ উসকে দেয়। মুহূর্তেই সেই লেখা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রাফিটির প্রতিক্রিয়া
গ্রাফিটির খবর আসাদের প্রশাসনের কানে পৌঁছাতেই মোউয়াইয়া এবং তার কয়েকজন বন্ধুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযোগ ওঠে, তাদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়— ইলেকট্রিক শক, মারধর, এমনকি ৪৫ দিন বন্দি রাখা হয়।
তবে বন্দি অবস্থায় তাদের ওপর হওয়া নির্যাতনের ছবি যখন জনসমক্ষে আসে, তখন পরিস্থিতি আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। বিক্ষোভ শুরু হয় দেশজুড়ে। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ, ‘ক্ষোভের দিন’ পালন করে সাধারণ মানুষ। আসাদের শাসনের অবসানের দাবিতে এটাই ছিল সিরিয়ার প্রথম বড় আন্দোলন।

১৩ বছরের গৃহযুদ্ধ
বিদ্রোহীদের সমর্থন দিতে এগিয়ে আসে আমেরিকা। অন্যদিকে, আসাদের সরকার রাশিয়া এবং ইরানের সহায়তা নেয়। বিদ্রোহ দমন করতে আসাদের প্রশাসন নৃশংসতার পথ বেছে নেয়। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো, ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
২০১১ সালে বিদ্রোহী সেনারা ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মি’ (এফএসএ) গঠন করলেও সংহতি এবং সম্পদের অভাবে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই শূন্যতা পূরণ করতে এগিয়ে আসে চরমপন্থী দলগুলি, যেমন— জাভাত আল-নুসরা এবং ইসলামিক স্টেট।
বাশারের পতন
১৩ বছরের গৃহযুদ্ধ সিরিয়াকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। পাঁচ লক্ষের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এক কোটির বেশি মানুষ শরণার্থী হয়েছেন। কিন্তু বিদ্রোহীরা সম্প্রতি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাশিয়া এবং ইরান, দুই মিত্র দেশের যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নেয় তারা।
বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘হায়াত তাহরির আল-শাম’ এবং ‘জইশ আল-ইজ্জা’র যৌথ আক্রমণে আসাদের সেনাবাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেয়ে বাশার পালাতে বাধ্য হন।
একটি গ্রাফিটির ইতিহাস
আজ মোউয়াইয়া সিয়াসন ২৭ বছরের যুবক। তার একটি গ্রাফিটি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন সিরিয়ার ইতিহাস বদলে দিয়েছে। সিরিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিদ্রোহীদের দাবি অনুযায়ী বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিদ্রোহের নেতা গোলানি দামাস্কাসের মসজিদে জয় ঘোষণা করেছেন।
এই ঘটনা কেবল একটি কিশোরের সৃষ্টিশীল প্রতিবাদের উদাহরণ নয়, এটি প্রমাণ করে কিভাবে একটি ছোট্ট পদক্ষেপও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। সিরিয়ার এই ইতিহাস বিশ্বজুড়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।