মানুষ মারার কষাইখানা: সিরিয়ার কুখ্যাত সৈদনায়া কারাগারে অকথ্য অত্যাচার ও হত্যার ইতিহাস

মানুষ মারার কষাইখানা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের এক অন্ধকার অধ্যায়ের নাম সৈদনায়া কারাগার। এখানে, বহু বছর ধরে চলে আসা মানবাধিকার লঙ্ঘন, অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভয়ে আতঙ্কে কাটিয়ে দিয়েছে হাজার হাজার বন্দি।…

December 9, 2024
1 min read

মানুষ মারার কষাইখানা

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের এক অন্ধকার অধ্যায়ের নাম সৈদনায়া কারাগার। এখানে, বহু বছর ধরে চলে আসা মানবাধিকার লঙ্ঘন, অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ভয়ে আতঙ্কে কাটিয়ে দিয়েছে হাজার হাজার বন্দি। ২০১১ সালে সিরিয়ায় সরকার পতনের পর, এই কারাগারের গেট খুলে দেওয়া হয় এবং মুক্তি পায় দীর্ঘদিন ধরে বন্দি থাকা অনেক কয়েদি। কিন্তু, সেই কারাগারের ভেতরের অবস্থা কেমন ছিল, তা জানলে রক্ত হিম হয়ে যায়। একে একে বেরিয়ে এসেছে অত্যাচারের বর্ণনা, যা চরম অমানবিকতার পরিচায়ক।

কুখ্যাত কারাগার ও অত্যাচারের চিত্র


অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস-এর প্রতিবেদনে জানা গিয়েছে, ২০১১ সাল থেকে সৈদনায়া কারাগারে একাধিক গুমখুন, নির্যাতন এবং হত্যা হয়েছে। একাধিক রিপোর্ট দাবি করেছে, এখানে প্রায় ৩০,০০০ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। বন্দিদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, তাদের জন্য কোনও খাবার, পানি বা ওষুধ সরবরাহ করা হত না। অত্যাচারের সময় বন্দিদের মুখ বেঁধে রাখা হত। কখনও কখনও এক বন্দিকে দিয়ে আরেক বন্দিকে ধর্ষণ করানো হত।

একটি ‘পার্টি’ বা গণহত্যা


সৈদনায়া কারাগারের ভেতরের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক অবর্ণনীয় ভীতি। বিশেষ করে, যেদিন বন্দিদের ফাঁসির সাজা কার্যকর হত, সে দিনটিকে ‘পার্টি’ বলে আখ্যায়িত করতেন কারারক্ষীরা। একে একে মৃত্যু নিশ্চিত করা বন্দিদের লাল ভবনের বেসমেন্টে নিয়ে আসা হত। সেখানে চলে অকথ্য অত্যাচার। তারপর গভীর রাতে, তাদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হত সাদা ভবনের নির্দিষ্ট কক্ষে। সেখানেই ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হত বন্দিদের।

প্রতি সপ্তাহে একবার বা দুবার এই ‘পার্টি’ হত, যেখানে ২০ থেকে ৫০ জন বন্দির ফাঁসি কার্যকর হত। এই ‘পার্টি’-র ব্যাপারে বন্দিরা কিছুই জানতেন না, তাদের জানানো হত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মাত্র মিনিটখানেক আগে। ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৩,০০০ বন্দিকে এইভাবে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছে, যা এক ধরনের গণহত্যারই সমান।

সৈদনায়ায় বন্দিদের জীবন


সৈদনায়ায় বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচারের কোনও সীমা ছিল না। সেখানে বন্দিরা শুধুমাত্র মারধরের শিকার হতেন না, যৌন নিগ্রহও হতো। তাদের শরীরের উপর এমন নির্যাতন চালানো হত, যা মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দিত। এক বন্দি মুক্তি পেয়ে ভিডিওতে জানিয়েছেন, সৈদনায়ার অত্যাচারের শিকার হয়ে তিনি নিজের নাম-ঠিকানা ভুলে গেছেন, তার শরীর ক্ষতবিক্ষত, মনও ভেঙে গেছে।

সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মুক্তির উল্লাস


সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী যখন দেশটির অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়, তখন সৈদনায়ার গেট খুলে যায় এবং বহু বন্দি মুক্তি পায়। তবে, এতে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির মধ্যে উল্লাস থাকলেও, সাধারণ বন্দিদের মুক্তি এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ‘হায়াত তাহরির আল-শাম’ এবং ‘জইশ আল-ইজ্জা’ নামক বিদ্রোহী গোষ্ঠী একে একে দেশটির শহরগুলো দখল করেছে।

এই বন্দিদের মুক্তি একদিকে যেমন আনন্দের, তেমনই অপরদিকে দুশ্চিন্তার কারণ। সৈদনায়ার গেট খুলতেই, সেই কারাগারের ভয়ঙ্কর ইতিহাস আবার আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। তবে, এতদিন ধরে চলে আসা এই অমানবিক কর্মকাণ্ডের শাস্তি এখনও দেওয়া হয়নি।

সিরিয়ার ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় শুধু দেশের নয়, পুরো বিশ্বের কাছে একটি শিক্ষা, যা মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ভয়াবহতা এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *