চিন্ময়কৃষ্ণকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর গ্রেফতারির পর দেশজুড়ে উত্তাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও রংপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভে নেমেছেন। কিন্তু কেন এই অশান্তি? চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ উঠেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের গভীরে গিয়ে এই ঘটনায় ঘটে যাওয়া প্রতিটি দিককে বুঝতে হবে।
চিন্ময়কৃষ্ণ দাস চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোট থেকেই সুবক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের ইসকনের সাথে যুক্ত হন এবং ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসকনের চট্টগ্রাম ডিভিশনের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য কাজ শুরু করেন এবং সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই মঞ্চের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা এবং তাদের উপর চলমান অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন।
পাশাপাশি, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষত, চট্টগ্রাম এবং রংপুরে একাধিক হিন্দু মন্দিরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। চিন্ময়কৃষ্ণ এই সমস্ত অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠেন এবং বিভিন্ন শহরে মিছিল, সভা ও সমাবেশের আয়োজন করেন। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে, চট্টগ্রামে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার দাবিতে একটি বড় সমাবেশের আয়োজন করেন চিন্ময়। তবে, এই সমাবেশের পরই বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
চিন্ময়কৃষ্ণের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অক্টোবরে চট্টগ্রামের ওই সমাবেশে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার উপরে একটি গেরুয়া পতাকা তুলে ধরেন। এই ঘটনাকে ‘জাতীয় পতাকার অপমান’ হিসেবে দেখা হয় এবং অভিযোগ ওঠে যে তিনি বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা করেছেন। চট্টগ্রামের বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মহম্মদ ফিরোজ খান থানায় অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে বলা হয় যে চিন্ময়কৃষ্ণ দেশের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার জন্য অশান্তি উসকে দিতে চাইছিলেন।
এই অভিযোগের পরেও চিন্ময়কৃষ্ণের কার্যক্রম থেমে থাকেনি। তিনি একাধিক সভা ও মিছিলের আয়োজন করেন, যার মধ্যে ২২ নভেম্বর রংপুরে অনুষ্ঠিত একটি সমাবেশে বিপুল সংখ্যক লোক জমায়েত হয়েছিল। এর পর ২৫ নভেম্বর, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার সময় চিন্ময়কৃষ্ণকে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর জামিনের আবেদন চট্টগ্রাম আদালত খারিজ করে দেয়।
চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেফতারি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম এবং রংপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বিক্ষোভের মাঝে পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে, যার ফলে এক আইনজীবী মৃত্যুবরণ করেন। এই সংঘর্ষ আরও বড় আকার ধারণ করেছে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেফতারি এবং তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ নিয়ে পুরো বাংলাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, এই গ্রেফতারি সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের প্রমাণ স্বরূপ, যা বর্তমানে এক সংকটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণের মুক্তির জন্য আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে এবং তিনি যদি জামিন না পান, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এদিকে, চিন্ময়কৃষ্ণের গ্রেফতারির পর বিশ্বজুড়ে তার সমর্থকরা ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এই ঘটনাকে নজরদারি রেখেছে, কারণ এটি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার আন্দোলনের এক বড় দিক।