হড়পা বান আসার তিন মাস আগেই চিনের কাছে!
বিপর্যয়ের আশঙ্কা আগেই আঁচ করা হয়েছিল। হড়পা বান নেমে আসার প্রায় তিন মাস আগে নেপাল ও চিনের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল কাঠমান্ডুতে। সেখানে সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা এবং দু’দেশের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান নিয়ে আলোচনা হয়। নেপালের দাবি, সেই বৈঠকেই চিনের কাছে হিমবাহের গতিপ্রকৃতি এবং ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে প্রয়োজনীয় তথ্য কাঠমান্ডুর হাতে পৌঁছয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৭ মে কাঠমান্ডুতে ওই বৈঠক হয়। নেপালের ১০ জন এবং চিনের প্রায় ১২ জন প্রতিনিধি সেখানে অংশ নেন। হিমালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্ভাব্য বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কী ভাবে দু’দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
নেপালের বন্যা সতর্কতা সংক্রান্ত বিভাগের জল বিশেষজ্ঞ সৌহর্দ্র জোশী জানান, তাঁদের মূল প্রয়োজন ছিল হিমবাহের গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়া। তাঁর কথায়, হিমবাহের চলন বা অবস্থার পরিবর্তন সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পারলে নেপালও সম্ভাব্য বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেত।
নেপালের দুই আধিকারিককে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, বৈঠকের পর হিমবাহজনিত ঝুঁকি এবং নদীর জলস্তর বৃদ্ধির বিষয়ে চিনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিপর্যয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
মাত্র কয়েক মিনিটের সতর্কবার্তা
নেপালের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রধান ধর্মরাজ উপরেতি ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, বুধবার নদীপথে হড়পা বান নেমে আসার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে কার্যত কোনও সময়ই ছিল না। তাঁর দাবি, মানুষ সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই কাদা, জল এবং পাথরের প্রবল স্রোত নেমে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা ভাসিয়ে দেয়।
আরও একটি বড় সমস্যা হল উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে পর্যাপ্ত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা। উপরেতির বক্তব্য, নেপালের ওই অঞ্চলে আবহাওয়া কেন্দ্রের সংখ্যা অত্যন্ত কম। একই সঙ্গে চিন ও নেপালের মধ্যে আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত আদানপ্রদানের কার্যকর ব্যবস্থাও নেই।
চিনের পাল্টা দাবি
নেপালের অভিযোগের পর অবশ্য চিনও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। চিনা দূতাবাসের বক্তব্য, হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আগাম বিপদের ইঙ্গিত পেলে প্রতিবেশী দেশগুলিকে সতর্ক করার চেষ্টা করে বেজিং।
নেপালে অবস্থিত চিনা দূতাবাস সমাজমাধ্যমে জানিয়েছে, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই হিমালয় অঞ্চলের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেপালের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়।
চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, বুধবারের বিপর্যয়ের পর তিব্বতের হিমবাহ এবং হিমবাহ থেকে তৈরি হ্রদগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
মৃত ৯০০ পার, নিখোঁজ হাজার হাজার
হড়পা বান ও সংশ্লিষ্ট বিপর্যয়ে নেপালে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৯০০ ছাড়িয়েছে। নেপাল পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সোমবার সকাল পর্যন্ত ৯০৩টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা ৪২৪৭। নিখোঁজদের মধ্যে ৩২০ জন বিদেশি নাগরিক।
উদ্ধার অভিযান সোমবার ষষ্ঠ দিনে পড়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের গভীরে এখনও বহু দেহ আটকে থাকতে পারে। ফলে উদ্ধারকাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিব্বতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের অন্য দিকে চিনের তিব্বতেও বুধবারের হড়পা বান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। চিনের হিসাবে, সেখানে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৭ জন নিখোঁজ।
নিখোঁজদের মধ্যে ৪৯ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে বেজিং। তামিলনাড়ুর একটি ভ্রমণ সংস্থার দাবি, ওই ৪৯ জনের একটি পর্যটকদল কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিল। বিপর্যয়ের পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু উদ্ধার ও ত্রাণের প্রশ্নই তুলছে না, বরং হিমালয় অঞ্চলে সীমান্ত পেরিয়ে আবহাওয়া, হিমবাহ ও জলস্তর সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত আদানপ্রদানের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।