সূর্যের আলো, একরাশ স্বপ্ন আর এক শিল্পীর মাটি ঘেঁষা ক্যানভাস: ‘পথের পাঁচালী’র নেপথ্যে বংশীকাকুর অবদান

সূর্যের আলো, একরাশ স্বপ্ন আর এক শিল্পীর মাটি ঘেঁষা ক্যানভাস তখন সকলেই বলেছিলেন, সূর্যের আলোয় ছবি তোলা যায় না। সিনেমা মানেই তো আলোর খেলা—তাহলে প্রাকৃতিক আলোয় কীভাবে হবে? কিন্তু সত্যজিৎ…

June 27, 2025
1 min read

সূর্যের আলো, একরাশ স্বপ্ন আর এক শিল্পীর মাটি ঘেঁষা ক্যানভাস

তখন সকলেই বলেছিলেন, সূর্যের আলোয় ছবি তোলা যায় না। সিনেমা মানেই তো আলোর খেলা—তাহলে প্রাকৃতিক আলোয় কীভাবে হবে? কিন্তু সত্যজিৎ রায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন, বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ হবে, এবং হবে ঠিক প্রাকৃতিক আলোর সাথেই। এই দুর্ভেদ্য সাহসে, পাশে ছিলেন কেবল একজন—বংশী চন্দ্রগুপ্ত, আমাদের প্রিয় বংশীকাকু। শিল্প নির্দেশক, প্রযোজক, প্রযোজনার চিত্রশিল্পী—এক অর্থে সিনেমার নেপথ্য স্থপতি।

কাশ্মীর থেকে আসা এই শান্ত-গম্ভীর শিল্পী তখন সদ্য থিয়েটার থেকে সিনেমায় পা রাখছেন। বংশীকাকুর চোখে ছিল নির্মল বাস্তবতার ছোঁয়া। বাবার সঙ্গে সেই প্রথম ছবিতেই এমনভাবে জুড়ে গেলেন, যে পরবর্তী ছবিগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই তিনি হয়ে উঠলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। ‘পথের পাঁচালী’র সেই বিখ্যাত কুঁড়ে ঘর, ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’র রাজ দরবার, কিংবা ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’-এর শুন্ডি রাজার জাঁকজমকপূর্ণ সভাঘর—সবই ছিল বংশীকাকুর কল্পনা, মাপজোক আর নিখুঁত কারিগরির ফল।

সত্যজিতের ইউনিটে বংশীকাকুই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তাঁকে ‘মানিক’ বলে ডাকতেন। শুধু সহকর্মী হিসেবে নয়, আমাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বংশীকাকু নিজ হাতে সেটে হাত লাগাতেন, দরজায় হাতুড়ি মারতেন, এমনকী প্রয়োজনে আলো প্রতিফলক নিয়ে দাঁড়াতেন। অথচ, কখনও অহংকার করেননি, কখনও নিজের গুরুত্ব জাহির করেননি।

‘নায়ক’ ছবির ট্রেন সেট বানানোর সময় বংশীকাকু এতটাই নিখুঁত হতে চেয়েছিলেন যে সেটে ট্রাকের টায়ার বসিয়ে সেট দোলানোর কথা ভেবেছিলেন। পরবর্তীতে সেট এত ভারী হয়ে যায় যে তা আর সম্ভব হয়নি। সারা রাত ঘুমোননি, কিন্তু বাবার দৃশ্যধারণে দর্শক বুঝতেই পারেননি ট্রেন নড়ছে না! এমনই ছিল তাঁদের বোঝাপড়া—একজনের সীমাবদ্ধতাকে অন্যজন শিল্পে পরিণত করতেন।

বংশীকাকুর ক্যামেরার চোখও ছিল দুর্দান্ত। ‘পথের পাঁচালী’র বহু স্থিরচিত্র তিনিই তুলেছিলেন। সিনেমার লোকেশন ঠিক হলেই ক্যামেরা, ফিতে, স্কেচপ্যাড হাতে নিয়ে ছবি তুলতেন জানলা-দরজা-মেঝে—সব কিছুর। তিনি চাইতেন বাস্তবের সঙ্গে শিল্প যেন মিলে যায় নিখুঁতভাবে।

বোম্বে থেকে ডাক এলেও, বংশীকাকু বাবার অনুমতিতেই গেলেন। বলেছিলেন, “মানিক, তোমার সঙ্গে আমার টাকার সম্পর্ক নেই।” পরে অবশ্য বাবারই পরামর্শে গেলেন আমেরিকায়, বাবার রেট্রোস্পেকটিভে যোগ দিতে। ট্রেনে উঠতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়লেন, আর আর ফেরেননি। সেই ১৯৮১ সালের ২৭ জুন, ওয়াশিংটনের এক হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বাবা সব অনুষ্ঠান বাতিল করে ফিরে এসেছিলেন দেশে।

বংশীকাকুর আপনজন বলতে কিছু ছিল না, কিন্তু আমাদের পরিবারে তিনি চিরকাল থেকে যাবেন। নিঃশব্দে, প্রতিটি সেটের পেছনে থাকা সেই শিল্পীর মতো—যাঁর স্পর্শে রূপ পায় বাস্তব, আলো-ছায়ার মায়ায় গড়ে ওঠে কালজয়ী ছবি।

স্মৃতি ধরে রাখার জাদু: মস্তিষ্কে অ্যাসিটোকোলিন সচল রাখতে রোজকার অভ্যেসে আনুন এই পাঁচ পরিবর্তন

Follow us on Google News Get real-time updates & exclusive sports coverage
Follow

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *